কলকাতার দুর্গা পুজো মানেই আলো, ঢাক, ভিড় আর নতুনের উচ্ছ্বাস। কিন্তু শহরের ঝলমলে পুজোর আড়ালে আজও এমন কিছু বনেদি বাড়ি আছে, যেখানে দুর্গাপুজো মানে সময়ের সঙ্গে হারিয়ে না যাওয়া এক ইতিহাস। হাওড়ার রামকেষ্টপুরের বসু বাড়িও তেমনই এক নাম। প্রায় ২০০ বছর ধরে একই বাড়িতে মা আসছেন। সময়ের হাত ধরে বদলে গিয়েছে মানুষ, হারিয়ে গিয়েছে বহু মুখ, তবু মাকে ঘিরে অপেক্ষাটা আজও একই। কারণ এই পুজো শুধু উৎসব নয়, দুই শতাব্দী ধরে বয়ে চলা এক পরিবারের শিকড় ও উত্তরাধিকার।

বসু পরিবারের আদি নিবাস ছিল আমতার কাছের সিঞ্চি শিবপুরে। পরে পরিবারটি রামকেষ্টপুরের এসে বসতি গড়ে। পরিবারের পূর্বপুরুষেরা জাহাজ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পারিবারিক সূত্রে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ঈশানচন্দ্র বসুর হাত ধরে এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা। কথিত আছে, দেবীর স্বপ্নাদেশই নাকি ছিল সেই পুজোর পিছনের কারণ। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয়েছিল এক যাত্রা, যার পথ পেরিয়ে গিয়েছে প্রায় দুই শতাব্দী। এই পুজোর ইতিহাস তাই শুধু প্রতিমা, মন্ত্র আর আচার দিয়ে লেখা নয়। এর প্রতিটি পাতায় জড়িয়ে আছে পরিবারের মানুষ গুলোও। এক প্রজন্ম যে দায়িত্ব সামলেছে, পরের প্রজন্ম তা কাঁধে তুলে নিয়েছে। আজও একই ভাবে কেউ দেখছেন পুজোর আয়োজন, কেউ ভোগ, কেউ অতিথি আপ্যায়ন। আর কেউ হয়তো দূরে থেকেও পুজোর কয়েকটি দিনের জন্য হলেও ফিরে এসেছেন পুরনো বাড়ির টানে। কারণ এই বাড়িতে দুর্গাপুজো মানেই পরিবারের আবার একসঙ্গে হওয়া।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু, বদলেছে পুজোর কিছু রীতিও। একসময় এই বাড়ির পুজোয় প্রচলিত ছিল বলি প্রথা। পরে তা বন্ধ হয়ে ফল বলির রীতি চালু হয় কিন্তু বর্তমানে সেই প্রথাটিও নেই। পরিবর্তনের এই ইতিহাস যেন দেখায়, ঐতিহ্য মানে কেবল পুরনো নিয়ম আঁকড়ে থাকা নয়, সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নিয়েও শিকড়কে ধরে রাখা। বসু বাড়ির ভোগেও রয়েছে নিজস্বতা। এখানে মাকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। নিবেদন করা হয় ময়দার ভোগ যেমন লুচি ও নানা প্রকারের ভাজাভুজি। এই পুজোর অন্যতম বিশেষ আচার কুমারী পুজো। ১১ বছর বয়সি ব্রাহ্মণ পরিবারের এক কন্যাকে কুমারী রূপে পূজা করা হয়। একচালা প্রতিমা, হাতে আঁকা চালচিত্র এবং সাদাটে-রুপোলি সিংহ এই পুজোর আলাদা পরিচয় বহন করে।
আজ সময় বদলেছে। পরিবারের অনেকেই ছড়িয়ে পড়েছেন নানা জায়গায়। তবু পুজো এলেই পুরনো বাড়ির ডাক তাঁদের ফিরিয়ে আনে। দুশো বছর ধরে এখানে শুধু মা একা ফিরে আসে না, তাঁর সঙ্গে ফিরে আসে আরও কিছু। ফিরে আসে পুরনো মুখ, পুরনো গল্প, আর একটি পরিবারের হারিয়ে না যাওয়া শিকড়। তাই রামকেষ্টপুরের বসু বাড়িতে দুর্গাপুজো শুধু ইতিহাস নয়, ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা মানুষগুলোরও এক নীরব উত্তরাধিকার। বসু বাড়িতে তাই প্রতি শরতে মা দুর্গা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন প্রায় ২০০ বছরের সেই হারিয়ে না যাওয়া সময়কেও।






































Discussion about this post