একসময় যে রেডিও ছিল বিনোদনের একমাত্র ভরসা, আজ তা নষ্ট হলে সারানোর হাতের খোঁজ পাওয়াটাও সময়ের সঙ্গে যেন দুর্লভ হয়ে উঠেছে। একটা পুরনো রেডিও হঠাৎ চুপ করে গেলে আজকাল সেটি সারানোর জন্য ছুটে যাওয়ার মানুষও খুব কম। অনেকের কাছে তার পরিণতি হয় আলমারির অন্ধকার কোণ, নয়তো সরাসরি নতুন যন্ত্র কেনা। অথচ একসময় রেডিও নষ্ট হওয়া মানেই ছিল মিস্ত্রির খোঁজ। প্রযুক্তি বদলের সঙ্গে বদলে গেছে সেই অভ্যাসও। এই ছবিটাই বদলে গেছে। আর তার আড়ালেই নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে একটি পেশা, একটি দক্ষতা, একটি কারিগরি ভাষা।
এই হারিয়ে যেতে বসা পেশার সঙ্গে এখনও যুক্ত কুমোরটুলির ৪০, বনমালী সরকার স্ট্রিটের অমিত রঞ্জন কর্মকার। ১৯৭৬ সাল থেকে রেডিও মেরামত করছেন তিনি। একসময় কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় এমন বহু দোকান ছিল। এখন রেডিওর ব্যবহার কমেছে, কমেছে মেরামতির কাজও। কলকাতার এই প্রবীণ কারিগরকেই অনেকে বলেন “দ্য লাস্ট রেডিও ম্যান অফ কলকাতা”। তাঁর হাতে এখনও পুরনো রেডিও ফিরে পায় তার শব্দ। কিন্তু পুরনো রেডিও সারানো কি শুধু তার জোড়া লাগানোর কাজ? মোটেই নয়। কয়েক দশক পুরনো যন্ত্রের ভিতরের অংশ, বৈদ্যুতিক সংযোগ, শব্দের সমস্যা কিংবা সংকেতের ত্রুটি বুঝতে লাগে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ফলে একটি নষ্ট সেটকে সচল করতে প্রয়োজন ধৈর্য, সূক্ষ্ম হাতের কাজ এবং পুরনো প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতি।
তাহলে নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসছে না কেন? এর বাজার ছোট। রেডিওর ব্যবহার কমে যাওয়ায় নিয়মিত কাজের নিশ্চয়তাও কমেছে। দ্বিতীয়ত, পুরনো যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন হওয়ায় মেরামতির কাজ সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, এই দক্ষতা শেখার নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণব্যবস্থাও নেই বললেই চলে। প্রযুক্তির যুগে তরুণদের কাছে এই পেশার তুলনায় স্থায়ী আয়ের অন্য পেশা বেশি আকর্ষণীয়। ফলে অভিজ্ঞ কারিগরের হাতে থাকা জ্ঞান পরের প্রজন্মে পৌঁছনোর আগেই থেমে যেতে পারে। অমিতবাবুর নিজের ছেলেও এই পেশায় আসেননি। অথচ তাঁর দোকানে এখনও পুরনো রেডিও আসে। কখনও বাবার, কখনও দাদুর ব্যবহার করা সেট। মানুষ সেগুলি সারাতে চান শুধু ব্যবহারের জন্য নয়, পুরনো যন্ত্রটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিটুকুও বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
যে দক্ষতা একসময় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছত, আজ তার পথটাই সংকুচিত। তাই প্রশ্নটা শুধু পেশার নয়, উত্তরাধিকারেরও। এই গল্প শুধু রেডিওর নয়, দক্ষতারও। প্রযুক্তি বদলাবে, যন্ত্র বদলাবে, বাজারও বদলাবে। যে হাত মৃত রেডিওয় শব্দ ফিরিয়ে আনে, তার উত্তরসূরি না থাকলে হারাবে একটি পেশার সঙ্গে পুরনো প্রযুক্তির কারিগরি ভাষাও। একদিন হয়তো রেডিও থাকবে সংগ্রহশালায়, থাকবে তার ইতিহাসও। কিন্তু তাকে আবার কথা বলানোর মানুষ হয়তো আর থাকবে না।






































Discussion about this post