বাঙালি দর্শকদের মনে আজও একটি জনপ্রিয় সিরিয়ালের নাম গেঁথে আছে, আর তা হলো ২০১০ সালে স্টার জলসা চ্যানেলে সম্প্রচারিত ‘গানের ওপারে’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নির্মিত এই ধারাবাহিকের গল্পটি আবর্তিত হয়েছিল রবীন্দ্রসঙ্গীতের দুই ভিন্ন ঘরানাকে কেন্দ্র করে। একদিকে ছিল প্রথাগত ও রক্ষণশীল রবীন্দ্রসঙ্গীত, আর অন্যদিকে ছিল আধুনিক ফিউশন। এই সিরিয়ালেই রক্ষণশীল ঘরানার প্রতিনিধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল এক শান্ত, স্নিগ্ধ মেয়ে ‘পুপে’, যে চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন মিমি চক্রবর্তী। প্রায় দশ মাস ধরে চলা এই সিরিয়ালে পুপের রবীন্দ্রভক্তি ও তার গানের গলা আজও মানুষের মনে তাজা। কিন্তু আপনারা কি জানেন, মিমির অভিনীত এই ‘পুপে’ নামটির সঙ্গে বাস্তবে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অত্যন্ত নিবিড় ও ভালোবাসার সম্পর্ক লুকিয়ে আছে? তাহলে আসুন, আজ সেই আসল পুপের গল্পটাই আপনাদের শোনাই।
রবীন্দ্রনাথের বাস্তব জীবনের ‘পুপে’ হলেন তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর পালিতা কন্যা নন্দিনী দেবী। দীর্ঘ বাইশ বছর নিঃসন্তান থাকার পর, ১৯২১ সালে রথীন্দ্রনাথ দম্পতি এক গুজরাটি ব্যবসায়ীর সন্তানকে দত্তক নেন। শিশুটির জন্মগত পিতার নাম ছিল চতুর্ভুজ দামোদর। তাঁর স্ত্রী যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতিমা দেবী শিশুটির লালনপালনের ভার সানন্দে নিজের কাঁধে তুলে নেন। কবিগুরু ভালোবেসে নাতনির নাম রেখেছিলেন ‘নন্দিনী’। তবে কবির ফরাসি বন্ধু আঁন্দ্রে কার্পেলেস ছোট্ট মেয়েটিকে আদর করে ফরাসি শব্দে ডাকতেন ‘পুপে’ (Poupee) বা পুতুল বলে। সেই থেকেই সে হয়ে ওঠে গোটা শান্তিনিকেতনের আদরের পুপে, পুপসি বা পুষু। রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও এই ছোট্ট মেয়েটি খুব সহজেই অধিকার করে নিয়েছিল বিশ্বকবির বিশাল হৃদয়।
পুপের সাথে কবির সম্পর্ক ছিল এক অমলিন বন্ধুত্বের। নোবেলজয়ী কবি হয়তো শান্ত সমুদ্রে জাহাজের কেবিনে বসে গম্ভীর কোনো লেখা লিখছেন, কিন্তু তিন বছরের পুপে এসে বাঘের গল্পের আবদার করলেই সব কাজ ফেলে হাসিমুখে তাঁকে বলতে হতো, “এক যে ছিল বাঘ, তার সর্ব অঙ্গে দাগ”। রবীন্দ্রনাথ দেশ-বিদেশের যেখানেই যেতেন—হোক তা শিলং, প্যারিস বা বুয়েনোস আইরেস, নাতনির বিরহ তাঁকে ব্যাকুল করে তুলত। বুয়েনোস আইরেসে থাকার সময় ভারত থেকে পাঠানো পুপের হিজিবিজি দাগ কাটা চিঠি দেখে কবির মনেও পাণ্ডুলিপিতে কাটাকুটি করে ছবি আঁকার শখ প্রবল হয়ে ওঠে। পুপেকে ঘিরেই তিনি সৃষ্টি করেছেন বহু গান, ছড়া আর গল্প। তাঁর রচিত ‘সে’, ‘খাপছাড়া’ এবং ‘পূরবী’-র মতো সৃষ্টিগুলোতে পুপের প্রভাব ও উল্লেখ রয়েছে। শুধু তাই নয়, শান্তিনিকেতনের বহু নৃত্যনাট্যেও পুপে তাঁর অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন।
পরবর্তীতে ১৯৩৯ সালে বোম্বাইয়ের বাসিন্দা অজিত সিং মোরারজি খাটাউয়ের সঙ্গে নন্দিনীর বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের বিপুল আড়ম্বর ও অর্থব্যয় নিয়ে কবি তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথের ওপর কিছুটা রুষ্ট হলেও, নাতনির প্রতি স্নেহে কোনো খামতি ছিল না। বিয়ের দিন নবদম্পতিকে তিনি সদ্য রচিত “প্রেমের মিলনদিনে” সহ তিনটি গান উপহার দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন। স্ত্রী মৃণালিনী দেবী এবং বৌঠান কাদম্বরী দেবীর পর সম্ভবত নন্দিনীই ছিলেন সেই সৌভাগ্যবতী নারী, যাঁকে ঘিরে কবির কলম এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। ‘গানের ওপারে’ সিরিয়ালের পুপে যেমন রবীন্দ্রসঙ্গীতকে আঁকড়ে ধরে বেঁচেছিল, বাস্তবের পুপেও ঠিক সেভাবেই আজীবন জড়িয়ে ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের গভীর স্নেহ ও সৃষ্টির এক অনবদ্য অনুপ্রেরণা হয়ে।






































Discussion about this post