“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে”― এই আহ্বান যেন শুধু গান নয়, জীবনদর্শন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির হৃদয়ে এমনভাবেই বেঁচে আছেন। তাঁর জন্মদিন ২৫শে বৈশাখ, এখন এক মহোৎসব। কিন্তু এই উদযাপনের শুরু অনেক আগেই। ১৮৮৭ সালে, ২৭ বছর বয়সে প্রথম তাঁর জন্মদিন পালিত হয়। সেদিন ভোরে সরলাদেবী ফুলের মালা, ধুতি-চাদর আর একটি বই নিয়ে পৌঁছেছিলেন তাঁর কাছে। সেখান থেকেই শুরু এক ঐতিহ্যের পথচলা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উদযাপন আরও বিস্তৃত হয়েছে। তবে এক বিশেষ জন্মদিনের স্মৃতি আলাদা করে মনে পড়ে। ১৯৩৮ সাল থেকে বেশ কয়েকবার তিনি গিয়েছিলেন মংপুতে, মৈত্রেয়ী দেবীর আমন্ত্রণে। অসুস্থ শরীরেও তিনি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। মৈত্রেয়ী দেবী ছিলেন দার্শনিক সুরেন দাশগুপ্তর কন্যা এবং গভীর রবীন্দ্রভক্ত। তাঁর আন্তরিক আহ্বানেই কবি সেখানে সময় কাটিয়েছিলেন। সেই শেষবারের সফরে ২৫শে বৈশাখ আসন্ন। পাহাড়ঘেরা নির্জন পরিবেশ, চারপাশে অল্প মানুষ – তবুও সেখানে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য আবহ।
মৈত্রেয়ী দেবীর ইচ্ছায় ঠিক হল, স্থানীয় পাহাড়ি মানুষদের নিয়েই হবে উৎসব। এই ভাবনাতেই ছিল এক অন্যরকম মানবিক সৌন্দর্য্য। উৎসবের দিন সকালেই শুরু হয় অনুষ্ঠান। স্নান সেরে কালো পোশাকে বাইরে এসে বসেন রবীন্দ্রনাথ। বৌদ্ধ স্তোত্র পাঠ, ঈশোপনিষদের শ্লোক – সব মিলিয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক। সেদিনই তিনি লেখেন ‘জন্মদিন’ শিরোনামে তিনটি কবিতা। বিকেলে পাহাড়ি মানুষজন দলে দলে আসেন। সানাই বাজে, নাচ শুরু হয়। গেরুয়া পোশাকে, মালা-চন্দনে সজ্জিত কবিকে দেখে সবাই মুগ্ধ। তাঁরা হয়তো তাঁর সাহিত্য জানতেন না, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ। সবাই আন্তরিক শ্রদ্ধায় তাঁকে অভিবাদন জানান।
পরদিন আনন্দের মাঝেই আসে দুঃসংবাদ – সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু। মুহূর্তেই বদলে যায় পরিবেশ। নীরব হয়ে যান কবি। সেইদিনই তিনি লেখেন ‘মৃত্যু’ কবিতা। জীবন আর মৃত্যুর দ্বন্দ্ব যেন তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তবু তিনি বিশ্বাস করতেন, আনন্দ নিজের ভেতরেই খুঁজে নিতে হয়। দুঃখের মাঝেও হাসিমুখে পথ চলার কথাই বলেছিলেন তিনি। এই জীবনদর্শনই তাঁকে করে তুলেছে চিরকালীন, চিরপ্রাসঙ্গিক।






































Discussion about this post