মণ্ডপে ঢুকেই মায়ের দশ হাতে যে অস্ত্রগুলি আমরা দেখি, সেগুলি কি শুধুই প্রতিমার সাজ? নাকি সেই ত্রিশূল, খাঁড়া আর চক্রের পিছনেও লুকিয়ে বাংলার অচেনা কারিগরদের গল্প? সেই গল্পের এক ঠিকানা হল হাওড়ার বীরশিবপুরের অস্ত্র গ্রাম। অন্যটি অবশ্যই নদিয়ার নবদ্বীপের পেতলশিল্পীদের পাড়া। যেখানে আগুন, ধাতু আর হাতুড়ির শব্দে তৈরি হয় মায়ের শক্তির প্রতীক। যেখানে ধাতুর গায়ে হাতুড়ির প্রতিটি আঘাত যেন বলে দেয়, মা আসছেন।
হাওড়ার বীরশিবপুরের গুটিনাগড়ি এলাকাকেই বলা হয়, ‘অস্ত্র গ্রাম’। বিরশিবপুরের এই অস্ত্র গ্রাম হয়তো সাধারণ মানুষের কাছে খুব পরিচিত নাম নয়। তবে দুর্গা পুজোর প্রস্তুতির সঙ্গে এই এলাকার যোগ বেশ ঘনিষ্ঠ ও পুরনো। এখানে কারিগরদের হাতে ধাতুর পাত ও প্রয়োজনীয় উপকরণ বদলে যায় দেবীর অস্ত্রে। পুজো যতো এগিয়ে আসে, কারিগরদের ঘরে ততই বেড়ে যায় ব্যস্ততা। পাতলা টিনের উপর প্রথমে আঁকা হয় অস্ত্রের নকশা। তারপর কাঁচি ও নানা সরঞ্জামের সাহায্যে কেটে নেওয়া হয় আকার। হাতুড়ির পরপর আঘাতে ধাতু পায় প্রয়োজনীয় বাঁক ও গড়ন। শেষে রং, নকশা আর সাজসজ্জার ছোঁয়ায় সেই সাধারণ ধাতুই হয়ে ওঠে দেবীর দশ হাতের অস্ত্র। এই অস্ত্রের চাহিদা শুধু স্থানীয় পুজোয় নয়, হাওড়া থেকে কলকাতা সহ বিভিন্ন জায়গার প্রতিমাতেও পৌঁছে যায় এই কারিগরদের তৈরি অস্ত্র।
যদিও মায়ের অস্ত্রের গল্প এখানেই শেষ নয়। নদিয়ার নবদ্বীপে পেতলশিল্পীদের হাতে পেতলের পাতের উপর ছেনি-হাতুড়ির নিখুঁত আঘাতে ফুটে ওঠে চক্র, শূল, খাঁড়া কিংবা ধনুর্বাণ। একটি ভুল আঘাতেই নষ্ট হতে পারে সূক্ষ্ম কাজ। তাই অভিজ্ঞতা ও ধৈর্যই এই শিল্পের মূল শক্তি। দুর্গা পুজোর পাশাপাশি কালী, জগদ্ধাত্রী-সহ নানা উৎসবের জন্যও তৈরি হয় দেবাস্ত্র। দুই জায়গার পদ্ধতি আলাদা হলেও উদ্দেশ্য এক যেটি হলো মায়ের রূপকে সম্পূর্ণ করা। পুরাণের সেই অস্ত্র আজও বাংলার কারিগরের হাতেই নতুন রূপ পায়। আধুনিকতার চাপে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, যতদিন মায়ের হাতে অস্ত্র উঠবে, ততদিন প্রয়োজন হবে এই অদৃশ্য কারিগরদের।
তাই পুজোমণ্ডপে মায়ের দশ হাতে যখন আলো পড়বে, শুধু দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে যাবেন না। একবার তাঁকিয়ে দেখবেন মা দুর্গার অস্ত্রগুলির দিকেও। সেই ঝলমলে ধাতুর আড়ালে হয়তো শুনতে পাবেন বীরশিবপুরের হাতুড়ির শব্দ। দেখতে পাবেন নবদ্বীপের পেতলের ওপর কারিগরের আঙুলের ছাপ। কারণ মায়ের অস্ত্র দেবীর হাতে পৌঁছনোর অনেক আগেই তৈরি হয়ে যায় বাংলার মাটিতে। এই গল্প তাই শুধু অস্ত্র তৈরির গল্প নয়। এটি সেই মানুষগুলির গল্প, যাঁদের নাম পুজোর আলোয় সামনে আসে না, অথচ তাঁদের হাত ছাড়া মায়ের সাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বিসর্জনের পর মণ্ডপ খালি হয়, উৎসব শেষ হয়। তবে তাঁদের হাতের কাজ আবার অপেক্ষা করে পরের বছর মায়ের আগমনের।






































Discussion about this post