দেবী দুর্গার সাজে যে রূপোলি ঝিলিক বাঙালির চোখে এত পরিচিত, তার গল্পে রয়েছে বিদেশের ছোঁয়া। মায়ের মুকুট, হার, কানের দুল কিংবা অস্ত্রের অলঙ্করণে ঝলসে ওঠা সেই সাজ একসময় এসেছিল সুদূর জার্মানি থেকে। ডাকযোগে আসা সেই উপকরণই কি বদলে দিয়েছিল বাংলার দুর্গাপুজোর সাজসজ্জা? উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাসের পাতায় আর বাংলার কারিগরের দক্ষ হাতে।
‘ডাকের সাজ’ নামটির উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে সবচেয়ে প্রচলিত একটি মত । একসময় নাকি জার্মানি থেকে ডাকযোগে বাংলায় আসত রূপোলি রাংতা, ধাতব ফয়েল ও নানা অলঙ্করণ সামগ্রী। সেই উপকরণ ব্যবহার করে দুর্গাপ্রতিমাকে সাজানোর চল থেকেই নাম হয় ‘ডাকের সাজ’। অর্থাৎ, ‘ডাক’ শব্দটি এখানে দেবীর কাছে কোনও চিঠির নয়, বিদেশ থেকে ডাকযোগে আসা সাজের স্মৃতি। তবে এই সাজ শুধু বিদেশি সামগ্রীর ইতিহাস নয়। বাংলার বনেদি পরিবারগুলির দুর্গাপুজোয় একসময় দেবীকে সোনা-রুপোর আসল গয়নায় সাজানোর রীতি ছিল। সময়ের সঙ্গে ব্যয়বহুল গয়নার পরিবর্তে রাংতা, শোলা এবং ধাতব অলঙ্করণ জনপ্রিয় হতে থাকে। দক্ষ শিল্পীরা পাতলা উপকরণ কেটে, ভাঁজ করে এবং নিখুঁতভাবে জুড়ে তৈরি করতেন মুকুট, হার, কানের দুল, কোমরবন্ধ, বাহুবন্ধসহ অসংখ্য সাজ।
বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি থেকে উপকরণ আসার পথ ব্যাহত হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। বিদেশি সামগ্রীর অপেক্ষায় না থেকে বাংলার শিল্পীরা স্থানীয় উপকরণ দিয়ে সেই রীতি টিকিয়ে রাখেন। ফলে ধীরে ধীরে বিদেশি উপকরণের সঙ্গে যুক্ত একটি সাজ হয়ে ওঠে বাংলার নিজস্ব শিল্প। আজও কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন বনেদি বাড়ির পুজোয় ডাকের সাজের উপস্থিতি দেখা যায়। থিমপুজোর আধুনিক চাকচিক্যের মধ্যেও তার সাবেকি সৌন্দর্য্য আলাদা করে চোখে পড়ে। কারণ এই সাজের মূল্য শুধু তার ঝিলিকে নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিতে।
তবে সময়ের সঙ্গে এই শিল্পের সামনে এসেছে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমের খরচ এবং পরিবর্তিত রুচির মতো নানা সমস্যা। তবু কারিগরের হাত থামেনি। কারণ ডাকের সাজ কোনও সাধারণ অলঙ্করণ নয়, এটি বাংলার পুজোর ইতিহাসের এক রূপোলি অধ্যায়। একদিন যে সাজ ডাকযোগে বিদেশ থেকে এসেছিল, আজ তা বাংলার মাটিতেই নতুন জীবন পায়। তাই মহালয়ার ভোরে মায়ের গায়ের রূপোলি সাজ শুধু সৌন্দর্য্য নয়, মনে করিয়ে দেয় যে ঐতিহ্য কখনও এক জায়গায় থেমে থাকে না। মানুষের হাতে, স্মৃতিতে আর উৎসবের আবেগে সে বারবার নতুন হয়ে ফিরে আসে। আর তাই ডাকের সাজের প্রতিটি রূপোলি ভাঁজে আজও ধরা পড়ে বাংলার পুরনো পুজো ও হারানো সময়। আজও সেই সাজের আড়ালে বেঁচে আছে বাঙালির আবেগ, স্মৃতি আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভালোবাসা।






































Discussion about this post