এক সময় বিকেল মানেই ছিল আড্ডা। পাড়ার মোর, চায়ের দোকান, বাড়ির রক-এ বসে চলতো রাজনীতি থেকে শুরু করে সিনেমা, খেলা, সংসার, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তর আলোচনা। সেই সময় বাঙালির জীবনে আড্ডা ছিল এক অদ্ভুত অনুভূতি। পাড়ার চায়ের দোকান, কলেজের ক্যান্টিন, কফি হাউস বা ক্লাবঘর, সব জায়গাতেই জমে উঠত গল্প, তর্ক আর হাসি। কিন্তু আজকাল সেই দৃশ্য বিরল। সময় বদলেছে। এখন এই আড্ডার জায়গায় এসেছে মোবাইল স্ক্রীন। যেমনভাবে যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবারে পরিণত হয়েছে, তেমনই বড় বড় আড্ডাগুলোও ছোট ছোট ব্যক্তিগত পরিসরে ভেঙে যাচ্ছে। যেন সমাজের সম্পর্কগুলোও এক ধরনের “নিউক্লিয়ার বিভাজন”-এর শিকার। যেখানে একসঙ্গে থাকার শক্তি ধীরে ধীরে টুকরো হয়ে যায়।
সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত রাখলেও সেই সংযোগ অনেকটাই ভার্চুয়াল। আগে যৌথ পরিবারে একসঙ্গে অনেক মানুষ থাকত। এখন ছোট নিউক্লিয়ার পরিবারে ব্যক্তিগত পরিসর বেড়েছে কিন্তু কমেছে একসঙ্গে সময় কাটানো। একসময় সিনেমা হল বা থিয়েটার ছিল সামাজিক মেলামেশার কেন্দ্র আর এখন মাল্টিপ্লেক্স আর ওটিটি প্ল্যাটফর্ম মানুষকে একা একাই বিনোদন উপভোগ করতে শিখিয়েছে। ৯টা-৫টার ব্যস্ত চাকরি, শহুরে ক্লান্তি আর ক্রমশ কমে আসা মনোযোগের ক্ষমতা মানুষকে আরও একা করে তুলছে। এখন একই টেবিলে বসেও অনেকে ফোন স্ক্রল করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। আগে যেখানে একটি সিনেমা দেখে বন্ধুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করত এখন তারা কয়েক সেকেন্ডের রিলস দেখেই পরের ভিডিওতে চলে যায়। মানুষ ধীরে ধীরে কথা বলার চেয়ে অনলাইন থাকাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। এই পরিবর্তনের ফলে সম্পর্কগুলোও যেন আরও ব্যক্তিগত, সীমাবদ্ধ এবং নীরব হয়ে উঠছে। ব্যস্ততার এই জীবনে অনেকেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার মানুষ খুঁজে পায় না। তাই ভিড়ের শহরেও একাকীত্ব আজ ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে আড্ডা মানে হয়তো গ্রুপ চ্যাট, ভিডিও কল বা সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্স। কিন্তু সেখানে কি সত্যিই সেই উষ্ণতা আছে? আগে মানুষ সময় নিয়ে কথা বলত, এখন মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে বেশি অভ্যস্ত। ব্যস্ততার এই যুগে অনেকেই নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব আর ব্যক্তিগত গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আটকে ফেলছে। হয়তো আড্ডা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, শুধু তার রূপ বদলেছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এত সংযোগের মাঝেও মানুষ আজ কেন এত একা? হয়তো একদিন মানুষ বুঝবে যে সবচেয়ে বেশি অভাব কোনও প্রযুক্তির নয়, বরং এমন একজন মানুষের, যার সাথে নিঃস্বার্থভাবে সুখ দুঃখের কথা ভাগ করে নেওয়া যায়।
প্রতিবেদক নয়ন্তিকা মুখার্জী






































Discussion about this post