রাজবাড়ির দেওয়ালে আজ আর রাজকীয় জৌলুস নেই। কিন্তু দুর্গা পুজো এলেই বদলে যায় গোটা পরিবেশ। জ্বলে ওঠে বেলজিয়াম থেকে আনা পুরনো ঝাড়বাতি। রেড়ির তেলের আলোয় ঝলমল করে ঠাকুরদালান। কোথাও আধুনিক বিজলির আলো। আবার তার পাশেই শতাব্দীপ্রাচীন তেলের বাতি। এই বাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবিগুরুর স্মৃতিও। সিনেমার শুটিংও হয় এখানে। আর পুজোর সময় ভিড় বাড়ে পর্যটকদের। বীরভূমের সুরুল সরকার বাড়ি তাই শুধু একটি রাজবাড়ি নয়। এটি যেন জীবন্ত ইতিহাসের এক টুকরো।

গল্পটা শুরু অষ্টাদশ শতকে। বর্ধমানের নীলপুরে থাকতেন ভরতচন্দ্র ঘোষ। সন্তান না থাকায় স্ত্রীকে নিয়ে বারাণসী যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পথে এসে পৌঁছন সুরুলে। আশ্রয় নেন গুরুদেব বাসুদেব ভট্টাচার্যের বাড়িতে। সেখানে শ্যামসুন্দরের পুজো করতেন তিনি। কিছুদিন পর তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় পুত্র। নাম কৃষ্ণহরি দাস। পরবর্তীকালে তিনিই সুরুলে দুর্গা পুজোর সূচনা করেন। মাটির ঠাকুরদালানে শুরু হয় পুজো। পরে তাঁর পৌত্র শ্রীনিবাস সরকার তৈরি করেন বিশাল পাকা ঠাকুরদালান। গড়ে ওঠে প্রাসাদসম অট্টালিকা।

এরপর সমৃদ্ধ হয় সরকার পরিবার। ফরাসি ও ইংরেজ কুঠিয়ালদের সঙ্গে চলত ব্যবসা। নীলচাষের পাশাপাশি চিনি ও কাপড় ছিল ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই সময়ই বেলজিয়াম থেকে আনা হয় নানা রঙের ঝাড়বাতি। আজও পুজোর সময় রেড়ির তেলে সেগুলি জ্বালানো হয়। রথের দিন কাঠামো পুজো দিয়ে শুরু হয় প্রতিমা গড়া। একই কাঠামোতেই প্রতি বছর মূর্তি তৈরি করেন শিল্পী। ষষ্ঠীতে বোধন। সপ্তমীতে পালকিতে নবপত্রিকার স্নান। এরপর মায়ের চক্ষুদান। ভোগেও থাকে দীর্ঘ তালিকা। লুচি, তরকারি, সুজি থেকে শুরু করে নানা মিষ্টি ও ফল।

তবে এই পুজোর অন্যতম বিশেষ রীতি বলি। সপ্তমীতে চালকুমড়ো। অষ্টমীতে পাঁঠা। নবমীতে চালকুমড়ো ও আখ। পাঁঠাবলির সময় বদলে দেওয়া হয় নারায়ণের স্থান। দশমীর সকালে হয় অপরাজিতা পুজো। তারপর মশাল জ্বালিয়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় কালীসায়রে। বাজে ঢাক। ফাটে আতসবাজি। রাজকীয় মর্যাদায় হয় বিসর্জন। এই পুজো ঘিরে বসে বিশাল মেলা। নাটমন্দিরে চলে যাত্রাপালা। রাজপাট নেই। সময় বদলেছে। কিন্তু সুরুল সরকার বাড়ির দুর্গাপুজো এখনও ধরে রেখেছে তার পুরনো ঐতিহ্য।
চিত্র ঋণ – বৈশাখী চৌধুরী






































Discussion about this post