দুর্গা পুজো মানেই ঢাকের শব্দ, কাশফুল, নতুন জামা আর প্যান্ডেল ঘোরা। তবে কয়েক দশক আগের পুজোর ছবিতে আরও একটি জিনিস অনিবার্য ছিল, যেটি হলো ‘ক্যাপ-বন্দুক’। নতুন জামার গন্ধ, প্যান্ডেলের আলো, দূরে বাজতে থাকা ঢাক আর পকেট থেকে বেরিয়ে আসা ছোট্ট টিনের বন্দুক। একসময় দুর্গাপুজোর এই ছবিটা ছিল বাংলার বহু শিশুর কাছে পরিচিত। বন্ধুদের সঙ্গে প্যান্ডেল ঘুরতে ঘুরতে ক্যাপ-বন্দুকের সেই চেনা শব্দে পুজোর আনন্দ যেন আরও পূর্ণতা পেতো। তবু পুরনো প্রজন্মের কাছে ক্যাপ-বন্দুক এমন এক নস্টালজিয়া, যা ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যাওয়া শৈশব।
ক্যাপ-বন্দুকের গল্প অবশ্য দুর্গা পুজো থেকে শুরু হয়নি। উনিশ শতকের শেষ দিকে ইউরোপ ও আমেরিকায় শিশুদের জন্য এমন খেলনা তৈরি হতে শুরু করে, যেখানে শব্দসৃষ্টিকারী ক্যাপের ওপর আঘাত করে গুলির মতো শব্দ তৈরি হত। পরে ‘কাউবয়’ সহ নানা দুঃসাহসিক চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার সঙ্গে এই খেলনা আরও পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রথমদিকে এগুলি ধাতু দিয়ে তৈরি হলেও পরে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ে। ভারতেও ক্যাপ-বন্দুক ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়। ছোট বন্দুকের সঙ্গে ব্যবহার করা হত কাগজের ক্যাপের রোল বা গোলাকার ক্যাপ। বন্দুকের হাতুড়ি ক্যাপের ওপর আঘাত করলে তৈরি হত সেই পরিচিত শব্দ।
বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে ক্যাপ-বন্দুকের সম্পর্ক বিশেষভাবে গড়ে ওঠে বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে পুজোর বাজারে এটি ছিল শিশুদের অন্যতম আকর্ষণ। নতুন জামা পরে মণ্ডপে ঘোরা, হাতে ক্যাপ-বন্দুক নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা। ক্যাপ শেষ হয়ে গেলে আবার দোকানে ছোটা, এসবই ছিল উৎসবের সামাজিক অভিজ্ঞতা। ক্যাপ-বন্দুক তখন শুধু খেলনা নয়, ছিল শৈশবের প্রতীক। কিন্তু আজ দৃশ্য বদলে গেছে। স্মার্ট ফোন, ভিডিও গেম, অনলাইন বিনোদন এবং ডিজিটাল খেলনা শিশুদের সময় দখল করেছে। যে খেলনা একসময় কয়েক ঘণ্টার কল্পনার জগৎ তৈরি করত, তার জায়গা নিয়েছে অসংখ্য ভার্চুয়াল জগৎ। পাশাপাশি শব্দ ও নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। ফলে পুজোর বাজারে ক্যাপ-বন্দুকের উপস্থিতিও কমেছে।
তবু ক্যাপ-বন্দুকের গল্প শুধু হারিয়ে যাওয়া একটি খেলনার গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের সামাজিক ইতিহাস, যখন আনন্দের জন্য প্রযুক্তির প্রয়োজন ছিল না। কয়েকটি ক্যাপ, একটি খেলনা বন্দুক আর একদল বন্ধু দিয়েই তৈরি হয়ে যেত উৎসব। হয়তো ভবিষ্যতে ক্যাপ-বন্দুক আরও বিরল হয়ে যাবে। কিন্তু পুরনো প্রজন্মের স্মৃতিতে এটি থেকে যাবে দুর্গাপুজোর ঢাকের তালে মিশে থাকা এক অমলিন শৈশবের প্রতিধ্বনি হিসেবে। কারণ কিছু জিনিস হারিয়ে যায়, কিন্তু তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সময় ও স্মৃতি কখনও হারায় না। এই খেলনা তাই সময় বদলের সরব সাক্ষী হয়ে আজও বহু মানুষের পুরনো স্মৃতিতে রয়ে গেছে। আসলে কিছু নস্টালজিয়া মস্তিষ্কের মেমোরি বাই লেন থেকে কিছুতেই ডিলিট হয়না।






































Discussion about this post