কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর গল্পে প্রতিটি বাড়িরই আলাদা ঐতিহ্য আছে। কোথাও জমিদারি আভিজাত্য। কোথাও পারিবারিক রীতি। আবার কোথাও মিশে আছে বৈষ্ণব ভাবধারা। বউবাজারের হিদারাম ব্যানার্জি লেনের নীলমণি দে ঠাকুরবাড়ি তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী পরিবার। হুগলি থেকে কলকাতায় এসেছিল এই সুবর্ণ বণিক পরিবার। পরে নীলমণি দে এই ঠাকুরবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩৭ সালে তাঁর জন্ম। ছোটবেলাতেই পিতৃহারা হন। মামার কাছেই বড় হন। প্রথমে কেরানির চাকরি করতেন। পরে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন।

একসময় স্বপ্নাদেশ পান নীলমণি দে। শ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ ও জগন্নাথদেবের মন্দির তৈরির নির্দেশ আসে। সেই অনুযায়ী ৪৫, হিদারাম ব্যানার্জি লেনের জমিতে তৈরি করেন সুন্দর দেবমন্দির। প্রতিষ্ঠা করেন লক্ষ্মী জনার্দন ও জগন্নাথদেবের বিগ্রহ। পরে অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তিও প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু হয় নিত্যপুজো। মন্দির পরিচালনার জন্য তৈরি করেন ট্রাস্ট বোর্ড। তাঁর পাঁচ পুত্রের পাঁচটি শাখা পালা করে দেবসেবার দায়িত্ব পালন করে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দায়িত্ব বদলায়। বংশপরম্পরায় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার এখানকার পুরোহিতের দায়িত্বও পালন করে আসছে।

এই বাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দুর্গাপুজো। পুজোর সময় সিংহাসন বদলে যায়। সারাবছরের সিংহাসন থেকে দেবীকে এনে বসানো হয় বড় রূপোর সিংহাসনে। প্রতিপদে হয় ঘটস্থাপন। ষষ্ঠীতে হয় বোধন। বৈষ্ণব মন্দির হওয়ায় পুজোয় বৈষ্ণব রীতিই মানা হয়। আমিষ ভোগের চল নেই। দেবীর ভোগে থাকে লুচি, কচুরি, নিমকি। থাকে বোঁদে, গজা, মালপোয়া ও সন্দেশের মতো বাড়ির তৈরি মিষ্টি। এই দুর্গাপুজোর বয়স প্রায় ১২৫ বছর।
ঠাকুরদালানের স্থাপত্যেও রয়েছে বিশেষত্ব। প্রচলিত তিন বা পাঁচ খিলানের বনেদি বাড়ির ছাপ এখানে নেই। বরং পুরো বাড়িটি দেখলে মনে হয় বৈষ্ণব মন্দির। তবে সবচেয়ে নজরকাড়া বৈশিষ্ট্য বাইরের দেওয়ালের বাংলা ডায়ালের ঘড়ি। বাংলার নিয়মেই তার কাঁটা সময় জানিয়ে চলে। দুর্গাপুজোর পাশাপাশি এই বাড়ির রথযাত্রা, লক্ষ্মীপুজো ও জগদ্ধাত্রী পুজোও বেশ পরিচিত। ঐতিহ্য, স্থাপত্য আর পারিবারিক রীতির মেলবন্ধনেই আজও স্বতন্ত্র নীলমণি দে ঠাকুরবাড়ি।
চিত্র ঋণ – শান্তনু ঘোষ, অমিতাভ গুপ্ত






































Discussion about this post