সুখের ভ্রমণটা হঠাৎই রূপ নিল এক আতঙ্কে। ছুটির আনন্দ, পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা বিহারের নির্মল দিনগুলো যেন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। চলন্ত ট্রেনের ভেতরেই সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর শরীর জ্বরে কাঁপছে, চোখ-মুখ ফ্যাকাশে, আর তিনটি ছোট সন্তানকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়লেন এক উকিলবাবু। ট্রেনটি আবার সব স্টেশনে থামবে না। বিপন্ন অবস্থা। চিকিৎসার কোনো উপায় নেই, আর সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। কীভাবে তিনি বাঁচাবেন তাঁর স্ত্রীকে? কীভাবে থামাবেন ট্রেন? চারদিকে শুধুই অনিশ্চয়তার ছায়া।
উকিলবাবু, যাঁর পেশা আইন আর নেশা সাহিত্য, তিনি তখন ঠান্ডা মাথায় ভাবা শুরু করলেন। স্ত্রীর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। তখনই তাঁর নজরে পড়ল ছোট ছেলের কোটের পকেট। সেখানে ছিল কুড়িয়ে পাওয়া কিছু নুড়ি,পাথর আর দু-একটি ফাঁকা শিশি। এই সামান্য জিনিসগুলোই যেন তাঁর কাছে হয়ে উঠল আশার আলো। তিনি একটি কাগজে লিখলেন—“আমার স্ত্রী খুব অসুস্থ, পরের স্টেশনে ট্রেনটা থামানোর ব্যবস্থা করুন।” তারপর সেই চিরকুটটি একটি শিশির মধ্যে ভরে, শিশির গলায় সুতো দিয়ে একটি নুড়ি-পাথর বেঁধে দিলেন।
ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। চলন্ত ট্রেন থেকে তিনি সেই শিশিটি ছুড়ে দিলেন একটি স্টেশনের দিকে। শিশিটি পৌঁছে গেল এক সহৃদয় স্টেশন মাস্টারের হাতে। তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিলেন। ফলস্বরূপ, শালবনে ঘেরা নির্জন এক ছোট্ট স্টেশন গুঝান্টিতে থেমে গেল ট্রেন। যেন প্রকৃতি নিজেই থমকে দাঁড়াল এক নতুন জীবনের আগমনের জন্য।
সেই স্টেশনেই, ট্রেনের কামরার ভেতর, জন্ম নিল এক কন্যাসন্তান। উকিল সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় ও তাঁর সহধর্মিণী সুবর্ণলতা দেবীর সেই কন্যা পরবর্তীকালে হয়ে উঠলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি আর কেউ নন, তিনি সুচিত্রা মিত্র। রবীন্দ্রসংগীতের প্রথিতযশা শিল্পী, যিনি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে নতুন প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁর কণ্ঠে। এক দুঃসহ বিপদের মধ্যেই জন্ম নিয়েছিল এক অনন্য সুরের ইতিহাস।






































Discussion about this post