কাশ্মীরের তুষারঢাকা উপত্যকা, লাদাখের হিমেল প্রান্তর আর শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এক অনন্য ঐতিহ্যের নাম পশমিনা। শুধু শীতবস্ত্র নয়, এটি ভারতীয় সংস্কৃতি, আভিজাত্য ও উত্তরাধিকারের প্রতীক। রাজদরবার থেকে সাধারণ মানুষের জীবনে, বিশেষত বাঙালি সমাজে, পশমিনা শাল দীর্ঘদিন ধরে সম্মান ও গৌরবের স্থান অধিকার করে আছে। সময়ের পরিবর্তনে এর ব্যবহার ও ব্যবসার ধরন বদলালেও পশমিনার ঐতিহ্য আজও অমলিন।

পশমিনা শালের ইতিহাস বহু প্রাচীন। লাদাখের চ্যাংথাং অঞ্চলে চ্যানটাঙ্গি ছাগলের কোমল লোম থেকে তৈরি হয় এই মহার্ঘ্য শাল। চ্যাংপা উপজাতির মানুষ সেই লোম সংগ্রহ করেন। পরে কাশ্মীরে তা সুতোয় রূপান্তরিত হয়ে দক্ষ শিল্পীদের হাতে বোনা হয়। অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও হালকা এই শাল সাধারণ উলের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ। মুঘল যুগে পশমিনা রাজকীয় পোশাকের মর্যাদা পায়, পরে ব্রিটিশ আমলে এর নকশায় নতুন বৈচিত্র্য যুক্ত হয়। কানি, আমিলকর বা দোশালা – বিভিন্ন ধরনের পশমিনা শালের বুনন ও অলংকরণে শিল্পীর অসামান্য দক্ষতার পরিচয় মেলে।

বাঙালি জীবনের সঙ্গে পশমিনার সম্পর্কও গভীর। একসময় বনেদি বাঙালি পরিবারে বিয়ের তত্ত্বে পশমিনা শাল দেওয়া ছিল ঐতিহ্যের অংশ। শীত এলেই কাশ্মীরি শাল বিক্রেতারা কলকাতার অলিগলিতে পসরা নিয়ে হাজির হতেন, তাঁদের সঙ্গে গড়ে উঠত দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও সম্পর্ক। তবে সময়ের সঙ্গে সেই আবেগ অনেকটাই ফিকে হয়েছে। আসল পশমিনার উচ্চমূল্য, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং যন্ত্রে তৈরি তুলনামূলক সস্তা শালের দাপটে হাতে বোনা পশমিনার চাহিদা কমেছে। তবুও নিউমার্কেট বা কাশ্মীরি এম্পোরিয়ামের মতো জায়গায় আজও আসল পশমিনার সন্ধান মেলে।

পরিবর্তিত সময় পশমিনা শিল্পকেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। উপত্যকার অশান্ত পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং নতুন প্রজন্মের অন্য পেশায় ঝোঁকার ফলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তবুও শত প্রতিকূলতার মাঝেও শিল্পীদের হাতে বেঁচে আছে পশমিনা – আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে, সংস্কৃতির স্মারক হিসেবে। শীতের হাওয়ায় আজও কাশ্মীরি শালওয়ালাদের আগমন যেন স্মরণ করিয়ে দেয় ঐতিহ্যের এই উষ্ণ স্পর্শ এখনও হারিয়ে যায়নি।
চিত্র ঋণ – https://www.pashmina.com






































Discussion about this post