উনিশ শতকের ভারতবর্ষ – রাজনীতি ও সংস্কৃতির এক টানাপোড়েনের সময়। ব্রিটিশ শাসনের বিস্তার ঘটলেও দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে কিছু অঞ্চল তখনও নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিল। সেই সময়েই অওধের নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শিল্পচর্চার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর শাসনামলে হোলির উৎসব শুধু রঙের আনন্দেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং হয়ে উঠেছিল সামাজিক ঐক্য ও সংস্কৃতির মিলনের প্রতীক।

এক বছর হোলি ও মহরম একই দিনে পড়ায় অওধের হিন্দুরা রং খেলা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। বিষয়টি জানতে পেরে নবাব ব্রাহ্মণ ও মৌলভিদের ডেকে জানান, দুই ধর্মের অনুষ্ঠানই সমান মর্যাদায় পালিত হবে। মুসলিম পরিবারে জন্ম হলেও প্রজাদের ধর্মকেই তিনি নিজের ধর্ম বলে মনে করতেন। অযোধ্যার হনুমান গঢ়ী মন্দির রক্ষায় তাঁর উদ্যোগ কিংবা হোলির গান রচনার মধ্য দিয়ে এই মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর রচিত গানে বারবার ফিরে এসেছে রঙের উৎসবের উচ্ছ্বাস ও মানবিক ঐক্যের বার্তা।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশদের হাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নবাব চলে আসেন কলকাতা শহরে এবং আশ্রয় নেন মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে। নির্বাসনেও তাঁর শিল্পপ্রেমে ভাটা পড়েনি। সঙ্গীত, নৃত্য ও নাট্যচর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে তাঁর দরবার। লক্ষ্ণৌতে থাকাকালেই তিনি ‘রাধা-কানহাইয়া কা কিসসা’ নামে ভারতবর্ষের প্রথম অপেরা রচনা করেন এবং মঞ্চে কৃষ্ণের ভূমিকায় অভিনয়ও করেন। কলকাতায় এসে তিনি বাংলার দোলপূর্ণিমার সঙ্গে লক্ষ্ণৌয়ের হোলির রীতি মিলিয়ে উৎসবকে নতুন মাত্রা দেন।
মেটিয়াবুরুজে আয়োজিত এক হোলি উৎসবে নবাব নিজেই নর্তকীর বেশে মঞ্চে উঠে ঠুমরি পরিবেশন করেছিলেন। পাথুরিয়াঘাটার রাজা সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরসহ বহু সংগীতজ্ঞ তাঁর আসরে উপস্থিত থাকতেন। ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে রঙের উৎসবকে তিনি মানুষের মিলনের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে, উৎসবের আসল সুর মানুষের হৃদয়ের ঐক্যেই নিহিত।






































Discussion about this post