“জগৎমাতা তুমি তারিণী, আনন্দময়ী দুঃখহারিণী…”—কালী ঠাকুরের প্রতি ভক্তজনের এই আরাধনা যুগ যুগ ধরে বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মুর্শিদাবাদের লালগোলার শ্রীমন্তপুরের শিকলে কালী মন্দিরও এমনই এক ঐতিহ্যের বাহক, যার ইতিহাস গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে লোকবিশ্বাস, সমাজসংস্কৃতি ও ধর্মীয় ভক্তির সঙ্গে। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লালগোলা কালী মন্দিরের মা কালী পূজিত হয়ে আসছেন। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো ব্যক্তিত্বদেরও আনাগোনা ছিল এখানে।
জানা যায়, ১৭৯০ সালে স্বপ্নাদেশে তৎকালীন লালগোলার রাজা রাও রামশঙ্কর নির্দেশ পান, এই রাজ পরিবারের দ্বারা অধিষ্ঠিত হয়েই কালী মন্দিরে পূজিত হবেন দেবী। সেইমতো এই কালী মন্দিরের পিছন দিয়ে প্রবাহিত পদ্মার শাখা নদীতে হঠাৎই একটি দেবীর কাঠামো ভাসতে দেখা যায়। পরে এতেই মাটি লাগিয়ে দেবীর প্রায় ৪ ফুট উচ্চতার একটি মূর্তি তৈরি করা হয়। এই এলাকার পুরোহিত গঙ্গাদাস চ্যাটার্জির থেকে জানা যায়, মা কালী স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেছিলেন তৎকালীন রাজা যেন পুজোর জন্য বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার মণ্ডল গ্রাম থেকে পুরোহিত আনার ব্যবস্থা করে। সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন রাজা। পরে ত্রৈলক্য ভট্টাচার্য ও ধর্মদাস পণ্ডিত নামের ওই দুই পূজারীকে এনে তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন রাজা।
১৯১৩ সাল নাগাদ রাজার উত্তরসূরী যোগীন্দ নারায়ণ রায় এই মন্দির সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করেন। এই মন্দির চত্বরের মধ্যেই মহাদেবের পুজোর জন্য আলাদা শিবের মন্দিরও নির্মাণ করা হয়। এখানে বছর বছর নতুন করে মাটি দিয়ে আলাদা আলাদা দেবীর মূর্তি নির্মাণ করা হয় না। এখনও পর্যন্ত সেই শতাব্দীপ্রাচীন একই মূর্তিতে হয়ে আসছে পুজো। তবে ওই প্রাচীন মূর্তি যাতে কোনোভাবেই ভেঙে না পরে, তার জন্য লোহার শিকল দিয়ে বাঁধা আছেন মা। যেই কারণে ‘শৃঙ্খলিতা কালী’ নামে ডাকা হয় দেবীকে। অবশ্য এক্ষেত্রে একটি ভিন্ন মতও প্রচিলত আছে। জনশ্রুতি অনুসারে, দেবীর অলৌকিক শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে, ভক্তরা বিশ্বাস করতেন যদি তাঁকে শিকল দিয়ে বেঁধে না রাখা হয়, তবে তিনি স্থান ত্যাগ করতে পারেন। এই বিশ্বাস থেকেই দেবীর নাম হয় শিকলে কালী।
ঐতিহাসিক আর সম্প্রীতির মেল বন্ধনের ফল এই শতাব্দী প্রাচীন কালী মন্দির। লালগোলা, মুর্শিদাবাদের এই অঞ্চল এক সময় নবাবদের শাসনাধীন ছিল এবং পরবর্তীকালে জমিদারি ব্যবস্থার বিস্তারের কারণে বিভিন্ন মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। শিকলে কালী মন্দিরও তেমনই এক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, যা স্থানীয় জনগণের গভীর ভক্তি ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। আজও এখানে প্রতি বছর কালীপুজোয় হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন দেবীর দর্শন করতে।
Discussion about this post