বুদ্ধিজীবী শুনলেই সাধারণ মানুষ এখন বিদ্রুপ করে বসে। কারণ অবশ্য সবার কাছে আলাদা আলাদা থাকে। তবে পকৃত বুদ্ধিজীবী হলেন এমন কিছু ব্যক্তি, যাঁরা নিজস্ব কর্ম, শিক্ষা, জীবনের প্রতিফলন কিংবা দর্শনবোধের মাধ্যমে সমাজে প্রভাব ফেলেন। এঁদের ধর্ম হল মানবতা ও নিরপেক্ষতা। এমনই এক মহিলা বুদ্ধিজীবীর জীবনদর্শন করাতে চলেছি আজ। যাঁর মৃত্যুদিনকে স্মরণ করে আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন হয় ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’।
১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ। বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জের কল্যাণনগর গ্রাম। জন্ম নেন সেলিনা পারভীন। পড়াশোনার পাট শেষ করে এলেন ঢাকাতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হলেন। তিনি ছিলেন নিজ সিদ্ধান্তে অনড় এক মানুষ। তাই কর্তৃপক্ষের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মতের অমিল হয়। এক বছরের মাথায় তিনি সেই পদ থেকে ইস্তফাও দেন। এরপর ‘ললনা’ পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ শুরু করেন। ‘শিলালিপি’ নামের একটি পত্রিকাও নিজের উদ্যোগে প্রকাশনা শুরু করেন। তৎকালীন প্রগতিশীল ও সমাজসচেতন প্রায় সব বুদ্ধিজীবীদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হত পত্রিকাটি। বেশ জনপ্রিয়তাও পায় সেটি।

এরপর এল সেই ভয়ঙ্কর মূহুর্ত। ১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাস। বাংলাদেশের উপর চলছে তখন পাকিস্তানী হামলা। চারিদিকে বোমার বিকট শব্দ, পোড়া বারুদের গন্ধ, এদিক ওদিক ছিটিয়ে থাকা রক্ত। ‘শিলালিপি’র একটির সংখ্যার বিরুদ্ধে অহেতুক নিষেধাজ্ঞা জারি করল পাকিরা। পরে নানা শর্ত সহযোগে পত্রিকাটি প্রকাশের অনুমতি দেয় তারা। কিন্তু সেলিনা পারভীন নিজের মেরুদন্ড বেচতে পারেননি। তাই শেষ সংখ্যা নিজের মতো করেই প্রকাশ করলেন। আর তাতেই ঘটল বিপত্তি। ১৩ ডিসেম্বর। ১১৫ নং নিউ সার্কুলার রোডের বাড়িতে তখন তিনি। ছাদে একটি লেখা লেখায় ব্যস্ত ছিলেন। বাড়ির উল্টো দিকে E.P.R.T.C-এর ফিয়াট মাইক্রোবাস ও লরি থামলো৷ সেই বাড়ির প্রধান ফটক ভেঙে ভিতরে ঢুকে গেল কিছু আল-বদর কর্মী৷ একই রঙের পোশাক পরা। মুখ রুমাল দিয়ে ঢাকা৷ সেলিনা পারভীনের ফ্ল্যাটে এসে কড়া নাড়ে তারা৷ সেলিনা নিজে দরজা খুলে দেন৷ তখনই তারা সেলিনাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়।

১৮ ডিসেম্বর। রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাঁর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন মৃতদেহটি পাওয়া যায়। পায়ে তখনও পরা সাদা মোজা। ঘৃণ্য নির্যাতনের চিহ্ন দেখে আঁতকে উঠেছিলেন সবাই সেদিন। তাঁর স্তন বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তারপর কেটে ফেলা হয়েছিল। আজিমপুর কবর স্থানে শহীদদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে ১৮ ডিসেম্বর এই শহীদ বুদ্ধিজীবীকে সমাহিত করা হয়৷ ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে আজও বিভীষিকাময় এক রাতের মত। বাঙালিদের উপর চলছিল অকথ্য অত্যাচার। অভিভাবকশূন্য করার ছকের দরুণ যে উজ্জ্বল তারকারা বাংলাদেশ হারিয়েছিলো তাঁদের মধ্যে অন্যতম সেলিনা পারভীন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতি বছরই ১৪ ডিসেম্বরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল এমন কিছু মানুষেরই।
তথ্য ঋণ – ফরিদুর রেজা খান
Discussion about this post