বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল আদালতে বাংলার প্রবেশ। একসময় বিচারব্যবস্থার ভাষা ছিল ফার্সি, যা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল দুর্বোধ্য ও দূরবর্তী। বিচারপ্রার্থীদের সুবিধার কথা ভেবে আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার চালুর জন্য যারা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন উনবিংশ শতকের এই বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সমাজচিন্তক। তাঁর উদ্যোগেই বিচারপ্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের ভাষার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

কলকাতার ঠাকুরবাড়ির ইতিহাসে জোড়াসাঁকোর নাম যেমন সুপরিচিত, তেমনই উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা ও জোড়াবাগান অঞ্চলেও ঠাকুর পরিবারের ঐতিহ্য ও প্রভাব বিস্তৃত ছিল। পঞ্চানন ঠাকুরের উত্তরসূরি দর্পনারায়ণ ঠাকুরের বংশেই ১৮০১ সালে গোপীমোহন ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন প্রসন্নকুমার। শৈশব থেকেই ইংরেজি শিক্ষার পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। বাড়িতে ব্রিটিশ শিক্ষকদের কাছে শিক্ষালাভের পর শেরবার্ন স্কুল ও হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করেন। ইংরেজি, বাংলা, ফার্সি, সংস্কৃত ও উর্দু ভাষায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি আইনশাস্ত্রের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। যা পরবর্তী জীবনে তাঁর কর্মপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কর্মজীবনের শুরুতে তমলুকের দেওয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীকালে আইন পেশাতেই তিনি নিজের প্রকৃত পরিচয় গড়ে তোলেন। সদর দেওয়ানি আদালতে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়ানি উকিল হিসেবে তাঁর খ্যাতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তিবাদী মনোভাব ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার জন্য তিনি বিশেষ সম্মান অর্জন করেন। আদালতে ফার্সি ভাষার পরিবর্তে বাংলা চালুর দাবিতে তিনি সোচ্চার হন। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে ভাষাগত বাধার কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টা, আবেদন ও লেখালিখির মাধ্যমে তাঁর উদ্যোগ সফল হয়। এরপর ১৮৩৮ সালে আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার অনুমোদিত হয়। একই সঙ্গে ১৮৩১ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘হিন্দু থিয়েটার’ বাংলার নাট্যচর্চায় নতুন যুগের সূচনা করে।
সমাজভাবনায় প্রসন্নকুমার ঠাকুর ছিলেন এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। রক্ষণশীল গৌড়ীয় সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সতীদাহ প্রথা বিলোপের ক্ষেত্রে তিনি প্রগতিশীল চিন্তার পরিচয় দেন এবং সমাজসংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেন। ব্রিটিশদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে সমালোচিত হলেও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। আজ ইতিহাসের আড়ালে তাঁর নাম কিছুটা ম্লান হয়ে গেলেও বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সমাজ উন্নয়নে তাঁর প্রচেষ্টা চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।






































Discussion about this post