মালাক্কা প্রণালীর সন্নিকটে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর দ্বীপ ভারতের সামুদ্রিক কৌশলগত মানচিত্রে এক বিশেষ স্থান। বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের সংযোগপথে অবস্থানের কারণে এই দ্বীপ পূর্ব ভারত মহাসাগরে নজরদারি ও প্রতিরক্ষা করে থাকে। এখানে অবস্থিত আইএনএস নৌবাহিনীর বিমানঘাঁটি ভারতকে মালাক্কা প্রণালীমুখী জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে। এই ভূ-কৌশলগত গুরুত্বের ভিত্তিতেই কেন্দ্র সরকার প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন করেছে। নীতি আয়োগের নেতৃত্বে ‘হলিস্টিক ডেভেলপমেন্ট অফ আইল্যান্ডস’ কর্মসূচির আওতায় গ্যালাথিয়া উপসাগরে আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল, একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর, গ্রিনফিল্ড টাউনশিপ, পর্যটন অবকাঠামো ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে এটি ভারতের ১৩তম প্রধান বন্দর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, যা কলম্বো বা সিঙ্গাপুরের মতো বন্দরগুলির উপর নির্ভরতা কমাবে।

কিন্তু, প্রকল্পটি ঘিরে শুরু থেকেই পরিবেশগত বিতর্ক তীব্র হয়েছিল। একাধিক পরিবেশ সংগঠনের আবেদনের প্রেক্ষিতে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল বিষয়টি খতিয়ে দেখে ১৬ ফেব্রুয়ারির নির্দেশে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেয়। ট্রাইবুনাল জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কোস্টাল রেগুলেশন জোন (সিআরজেড) বিধি কঠোরভাবে মানতে হবে। পরিবেশগতভাবে অতি সংবেদনশীল এলাকায় কোনও নির্মাণ করা যাবে না, নির্ধারিত অঞ্চলে কাজ সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে; অন্যথায় প্রকল্প স্থগিতও হতে পারে।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা মূলত দ্বীপটির অনন্য জীববৈচিত্র্য নিয়ে। প্রায় ১,০৩,৮৭০ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্যে ১,৮০০-রও বেশি প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের বাস এখানে। গ্যালাথিয়া নদীর মোহনা বিরল লেদারব্যাক কচ্ছপের গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ক্ষেত্র। দ্বীপটি সুন্দাল্যান্ড জীববৈচিত্র্য হটস্পটের অংশ। নিকোবর মেগাপোড, নিকোবর ট্রিশ্রু ও বিভিন্ন স্থানিক উদ্ভিদের আবাসস্থল। গবেষকদের মতে, বনভূমি উজাড় হলে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি, মাটি ক্ষয় এবং প্রবাল প্রাচীরের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে পরিপক্ব রেনফরেস্টের বিকল্প সৃষ্টি কার্যত অসম্ভব।
সামাজিক প্রভাবও অবশ্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শোম্পেন সম্প্রদায়; যারা ‘প্রিমিটিভ ভালনারেবল ট্রাইবাল গ্রুপ’ হিসেবে চিহ্নিত এবং নিকোবারিজদের জীবনযাত্রা বন ও সামুদ্রিক সম্পদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০০৪ সালের সুনামির পর পুনর্বাসনের অভিজ্ঞতা এখনও তাজা। মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা, বৃহৎ অবকাঠামো ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ তাদের সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে বিপন্ন করতে পারে। সরকারের দাবি, উন্নয়ন হবে পরিবেশবান্ধব ও অংশগ্রহণমূলক মডেলে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, প্রকল্পটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সূক্ষ্ম ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। উন্নয়ন ও সংরক্ষণের এই দ্বন্দ্বই এখন গ্রেট নিকোবরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল প্রশ্ন।






































Discussion about this post