সময়ের স্রোতে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে এক অনন্য ঐতিহ্য, বালাম ধান(Balam Rice)। একসময় যে ধানের সুবাসে ভরে উঠত দক্ষিণাঞ্চলের ঘরবাড়ি, আজ তা স্মৃতির পাতায় ধূসর হয়ে যাচ্ছে। সরু দানার সুস্বাদু বালাম চাল ছিল মানুষের গর্ব, রসনার তৃপ্তি এবং কৃষকের পরম সম্পদ। নদীবিধৌত পলিমাটির বুকে জন্ম নেওয়া এই ধান যেন এক ইতিহাস, যার অস্তিত্ব আজ বিলীন হওয়ার পথে।
বালাম ধান প্রাকৃতিক সারনির্ভর হওয়ায় এর উৎপাদন খরচ ছিল কম এবং কৃষকেরা সহজেই এটি চাষ করতে পারতেন। অল্প সেচেই প্রতি হেক্টরে প্রায় ৪ টন ফলন পাওয়া যেত। শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও এই চালের ব্যাপক চাহিদা ছিল। পাশাপাশি কালিজিরা ও দুধকমল জাতের ধানও সুস্বাদু ও জনপ্রিয় ছিল। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার উৎকৃষ্ট চাল বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। চীনা পর্যটক Xuanzang (হিউয়েন সাং) ৭ম শতকে বাংলার উর্বর ভূমি ও খাদ্যশস্যের প্রাচুর্যের প্রশংসা করেন। পরবর্তীতে ১৪শ শতকে আগত মরক্কোর পর্যটক Ibn Battuta (ইবনে বতুতা) বাংলার চালের উৎকৃষ্ট মান ও সুস্বাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। যদিও তারা সরাসরি “বালাম ধান” উল্লেখ করেননি, তবে তাদের বর্ণনা বালাম ধানের মানের সঙ্গে মিলে যায়।
একসময় বালাম চাল শুধু দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি ও ভোলা অঞ্চলে এর ব্যাপক উৎপাদন হতো এবং সেখান থেকে দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা হতো। ঢাকাসহ বড় শহরের বাজারগুলোতেও বালাম চালের বিশেষ কদর ছিল। এমনকি উৎসব, বিয়ে বা বিশেষ আয়োজনেও এই চাল ব্যবহার করা হতো, যা এর জনপ্রিয়তার প্রমাণ বহন করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যচাহিদা বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যার চাপ কৃষি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে। ১৯৭৪ সালের খাদ্যসংকটের পর উফশী জাতের ধান চাষ শুরু হয়, যা অধিক ফলনশীল হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীতে ভোজন ধান এবং হাইব্রিড জাতের ধান, যেমন ব্রি-৪৭, কৃষকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, কারণ এতে প্রতি হেক্টরে ৬–৭ টন পর্যন্ত ফলন সম্ভব। ফলে কৃষকেরা বেশি লাভের আশায় ঐতিহ্যবাহী বালাম ধান থেকে সরে আসতে থাকেন।
বর্তমানে বালাম ধান খুবই সীমিত পরিসরে টিকে আছে, প্রধানত শৌখিন চাষিদের উদ্যোগে। তবে এই ধানের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্য সংরক্ষণ জরুরি। গবেষণা ও সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে দেশীয় ধান পুনরুজ্জীবনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। নইলে বালাম, কালিজিরা ও দুধকমল একসময় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এগুলোকে শুধু গল্প হিসেবেই জানবে।







































Discussion about this post