হিমালয়ের পাদদেশে তখন নিস্তব্ধ বিকেল। আচমকা কুঠারের শব্দে কেঁপে ওঠে উত্তরাখণ্ডের রেনি গ্রামের বনভূমি। গাছ কাটতে এগিয়ে আসা শ্রমিকদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন একদল নারী। তাঁদের চোখে ভয় নেই, কণ্ঠে প্রতিবাদ—“গাছ কাটতে হলে আগে আমাদের কাটো।” সেই মুহূর্তে, ১৯৭৪ সালের সেই দৃশ্য যেন শুধু একটি গ্রামের লড়াই ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতি রক্ষার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন গৌরা দেবী; এক সাধারণ নারী, যাঁর অপার সাহস বদলে দিয়েছিল পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস।
গৌরা দেবীর জন্ম হয়েছিল উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলের এক সাধারণ পরিবারে। অল্প বয়সেই বিয়ে, তারপর সংসারের দায়িত্ব। জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। তিনি ছিলেন রেনি গ্রামের মহিলা মণ্ডলের প্রধান, এবং গ্রামের বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নারীদের নির্ভরশীলতা খুব কাছ থেকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। জ্বালানি কাঠ, পশুখাদ্য, জল সবকিছুর জন্য বন ছিল তাঁদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই যখন বন কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত এল, তিনি বুঝেছিলেন শুধু গাছ হারানোর প্রশ্ন নয়, এটি আসলে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
এই প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় Chipko Movement বা চিপকো আন্দোলন। ১৯৭০-এর দশকে উত্তরাখণ্ড অঞ্চলে নির্বিচারে বন উজাড় শুরু হয়েছিল বাণিজ্যিক স্বার্থে। কিন্তু স্থানীয় মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়েন। “চিপকো” শব্দের অর্থই হলো ‘জড়িয়ে ধরা’—গাছকে আলিঙ্গন করে রক্ষা করা। গৌরা দেবীর নেতৃত্বে রেনির নারীরা এই আন্দোলনকে বাস্তব রূপ দেন। পরবর্তীতে এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বন সংরক্ষণ নীতিতে বড় পরিবর্তন আনে। সরকারকে বাধ্য করা হয় পাহাড়ি অঞ্চলে গাছ কাটার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে। শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বজুড়েও এই আন্দোলন পরিবেশবাদী চিন্তাধারাকে নতুন দিশা দেখায়।
আজ, যখন জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং পরিবেশ ধ্বংস আমাদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে, গৌরা দেবীর গল্প নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর সাহস প্রমাণ করে পরিবর্তন আনার জন্য বড় ক্ষমতা নয়, প্রয়োজন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি। গৌরা দেবী ও তাঁর সহযোদ্ধারা দেখিয়েছিলেন, সাধারণ মানুষও ইতিহাস লিখতে পারে।





































Discussion about this post