ফাল্গুনের হাওয়ায় যখন প্রথম আবির ওড়ে, তখনিই ধর্মের দেওয়াল ভেঙে সেই আবির রঙ ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে। ভারত উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের সাংস্কৃতিক দেওয়া–নেওয়া বহু শতাব্দীর পুরোনো। ভাষায়, পোশাকে, সঙ্গীতে, খাদ্যে এবং উৎসবে। সেই ঐতিহ্যেরই এক উজ্জ্বল প্রতীক হোলি বা দোল। বসন্তের এই উৎসব কেবল মন্দিরচত্বরে সীমাবদ্ধ ছিল না; তার রঙ পৌঁছে গিয়েছিল মুঘল দরবারের রাজকীয় প্রাঙ্গণেও। সেখানেও রঙের হাসি ঘোষণা করত যে, সংস্কৃতির মিলনই এই ভূখণ্ডের প্রকৃত শক্তি।
জাহাঙ্গীরের আমলে হোলি উদ্যাপনের বর্ণনা পাওয়া যায় সমসাময়িক চিত্রকর্ম ও স্মৃতিকথায়। অনেক চিত্রে দেখা যায়, সম্রাট নিজে রঙে রাঙা পোশাকে রাজ অঙ্গনে রং খেলছেন। তার আগে সম্রাট আকবরও বিভিন্ন ধর্মের উৎসবকে রাজ-আনুষ্ঠানিকতার অংশ করে তুলেছিলেন। আকবরের ‘সুলহ-ই-কুল’ বা সর্বধর্ম সমন্বয়ের নীতির প্রভাবেই দরবারে হোলির মতো তথাকথিত ‘হিন্দু উৎসব’ স্থান পায়। রঙের এই খেলায় শুধু আনন্দ নয়, ছিল রাজনৈতিক বার্তাও। সেই বার্তা ছিল এই, যে সম্রাট সকল প্রজার উৎসবকেই সম্মান করেন।
শাহজাহানের সময় রাজকীয় আড়ম্বর আরও বাড়ে। প্রাসাদের অন্দরমহলে রঙিন জলের ঝর্ণা, আতর মেশানো আবির আর সুর-সঙ্গীতের আসর বসত। ঐতিহাসিকদের মতে, হোলি তখন ‘আব-ই-পাশি’ বা ‘ঈদ-ই-গুলাবি’ নামেও পরিচিত ছিল দরবারে। সম্রাট ও রাজপরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে রঙ ছিটিয়ে শুভেচ্ছা জানাতেন। রাজপুত রাণীদের উপস্থিতি এই উৎসবকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছিল, কারণ তাঁদের মাধ্যমে হিন্দু আচার-অনুষ্ঠানের নানা উপাদান মোগল সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে।
স্বতস্ফূর্ত আনন্দের সামনে ধর্ম কখনো চূড়ান্ত প্রাচীর হতে পারেনা। উৎসবই বহুবার ভেঙেছে বিভেদের দেয়াল। আনন্দ সবার, ভালোবাসা সবার, রঙ খেলার উল্লাসও সবার। এই ইতিহাসও আমাদের ভারতের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক মন গড়ে ওঠার একটি বড় অংশ। একে কোনমতেই অস্বীকার করা চলেনা। এই ঐতিহ্য আমাদের সভ্যতার ভিত্তি, আমাদের রাষ্ট্রচিন্তারও এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাই এই ইতিহাসকে অস্বীকার করা মানে নিজের শিকড়কে অস্বীকার করা।






































Discussion about this post