একটি দেশ, একটি সংবিধান, একটি আদালত কিন্তু ন্যায়বিচারের দুই মাপ। এক পাশে উমর খালিদের মতো কণ্ঠ, যে প্রশ্ন তোলে, ক্ষমতার চোখে চোখ রাখে। অন্যদিকে গুরমিত রাম রহিম, দণ্ডিত অপরাধী, যার জন্য কারাগারের তালা বারবার খুলে যায়; বা দণ্ডিত ধর্ষক, যাদের জন্য জেলের তালা খুলে তাদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। এই বৈপরীত্য আজ কেবল আইনের নয়, রাষ্ট্রের চরিত্রের। তা মানুষের কাছে স্পষ্ট। এখানে প্রশ্ন করা অপরাধ, আর ক্ষমতার ছায়ায় থাকাই হল মুক্তির শর্ত।
উমর খলিদকে ২০২০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ ছিল ২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লি দাঙ্গার ‘ষড়যন্ত্রে’ তাঁর ভূমিকা আছে। তাঁর বিরুদ্ধে ইউএপিএ (Unlawful Activities Prevention Act) ও ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারা প্রয়োগ করা হয়। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-বিরোধী আন্দোলনে তাঁর বক্তৃতা ও সাংগঠনিক ভূমিকা থেকেই মূলত তাঁকে নিশানা করা হয় বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ। গ্রেপ্তারের আগে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরে বিচার ছাড়া দীর্ঘ কারাবাস। উমর খলিদের সঙ্গে একই আন্দোলনের সূত্রে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন শরজিল ইমাম, খালিদ সাইফি, গুলফিশা ফাতিমা, নাতাশা নারওয়াল, দেবাঙ্গনা কলিতা ও সাফুরা জারগারের মতো একাধিক ছাত্র ও সমাজকর্মী।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় আদিবাসী অধিকারকর্মী ও অধ্যাপকদের দীর্ঘ বিচারহীন বন্দিত্ব, কারাগারে স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু, বিচারহীন বন্দি সোনাম ওয়াংচুক, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা, গণধর্ষণ ও নৃশংস অপরাধে দণ্ডিতদের সাজা মকুব, প্যারোলের সুবিধা, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ছাত্রছাত্রীদের উপর হামলা, হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের রোহিত ভেমুলার প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের পরিণতি, কাশ্মীর ও আসামের ছাত্রনেতাদেরও ইউএপিএ আইনে জড়ানো ইত্যাদি সমস্তই খুব স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন তোলা, সংবিধানের কথা বলার অপরাধে ছাত্র রাজনীতিকে ক্রমশ জেলখানা আর চার্জশিটের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত রাম রহিম প্যারোল পেয়েছেন প্রায় পনেরবার। কখনও উৎসব, কখনও আশ্রম, কখনও ‘ভাল আচরণ’। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আইনের বইয়ে লেখা ধারার নয়, প্রয়োগের রাজনীতির। যে রাষ্ট্র উমর খালিদের কণ্ঠে শিকল পরায়, সে রাম রহিমের জন্য কারাগারের দরজা খোলে। যে রাষ্ট্র প্রশ্নকে ভয় পায়, সে অপরাধীর সঙ্গে আপস করে। আজ যারা প্রশ্নকে জেলে আটকে রাখতে চায়, কাল তাদেরই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। ইতিহাস অন্তত তাইই বলে। কারণ ন্যায় যদি সবার জন্য সমান না হয়, তবে সেই রাষ্ট্রও আর সবার থাকে না।







































Discussion about this post