ভিড়ভাট্টার তাঁবুতে আলো জ্বলছে, সামনে উচ্ছ্বসিত দর্শক। টিকিট কেটে তারা এসেছে একজন মানুষকে দেখবে বলে – হাসবে, আঙুল তুলবে, বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন এক মহিলা, যাকে সে সময় গোটা দুনিয়া চিনত ‘সবচেয়ে কুৎসিত’ বলে। কিন্তু আলো ঝলমলে সেই প্রদর্শনীর আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক মায়ের নিরুপায় লড়াইয়ের ইতিহাস। তাঁর নাম মেরি অ্যান বেভান – যাঁর জীবন কেবল কৌতূহলের বিষয় নয়, মানবিকতার আয়নাও বটে।
মেরি অ্যান জন্মেছিলেন একেবারে সাধারণ চেহারা নিয়ে। পেশায় ছিলেন প্রশিক্ষিত নার্স, সংসারে স্বামী ও চার সন্তান – সব মিলিয়ে স্বাভাবিক, পরিপাটি জীবন। কিন্তু আচমকাই তাঁর শরীরে ধরা পড়ে অ্যাক্রোমেগালি, এক বিরল হরমোনজনিত রোগ। অতিরিক্ত গ্রোথ হরমোনের প্রভাবে মুখের হাড়, নাক, চোয়াল, হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে বড় হতে থাকে। আয়নায় নিজেকে চিনতে কষ্ট হত তাঁর। এর মধ্যেই স্বামীর অকালমৃত্যু তাঁকে সম্পূর্ণ অসহায় করে দেয়। তিনি চারটি ছোট সন্তানের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যখন কাজের খোঁজে বেরোলেন, সমাজ তখন তাঁর দক্ষতা নয়, চেহারাকেই বিচার করল। একজন যোগ্য নার্স হয়েও দরজা বন্ধ হয়ে গেল একের পর এক।
অবশেষে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন, যা ভাবলেও বুক কেঁপে ওঠে। ‘আগ্লিয়েস্ট ওম্যান’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেন তিনি। জানতেন, মানুষ তাঁকে দেখে উপহাস করবে। তবুও অপমানের ভয়কে গিলে নিলেন মাতৃত্বের দায়ে। প্রতিযোগিতায় জেতার পর আমেরিকার সার্কাস ও সাইডশোতে কাজ শুরু করেন। দর্শকেরা টিকিট কেটে আসত তাঁকে দেখে হাসতে; কিন্তু কেউ দেখতো না তাঁর মনের গভীর ক্ষত। তিনি নিজের চেহারাকেই রুজির অস্ত্র বানালেন। কারণ তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় ছিল সন্তানদের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেওয়া।
সমাজ তাঁকে যে তকমা দিয়েছিল, ইতিহাসও অনেকদিন সেই নামেই তাঁকে মনে রেখেছে। অথচ সত্যিটা অন্য। মেরি অ্যানের সৌন্দর্য ছিল না মুখাবয়বে, ছিল তাঁর সাহসে, আত্মসম্মানে এবং অক্লান্ত ত্যাগে। বাহ্যিক রূপের আড়ালে যে অসীম মানবিক শক্তি লুকিয়ে থাকতে পারে, তাঁর জীবন তারই প্রমাণ। আজও যখন চেহারা দিয়ে মানুষকে বিচার করা হয়, মেরি অ্যানের গল্প মনে করিয়ে দেয় – সবচেয়ে বড় কুৎসিততা মুখে নয়, দৃষ্টিভঙ্গিতে।






































Discussion about this post