পূর্ব বর্ধমান জেলার জৌগ্রামে অনুষ্ঠিত মহিন্দর শ্মশানকালী পুজো বর্তমানে হয়ে উঠেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী কালীপুজোগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিবছর চৈত্র মাসের ১৬ তারিখে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং এই একটা দিনকে কেন্দ্র করে আনন্দে মেতে উঠে গোটা গ্রাম। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই পুজোর বয়স প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ বছর। আগেকার দিনে বাংলার ফাল্গুন চৈত্র মাস অর্থাৎ বসন্তকালে কলেরা মহামারীর আকার ধারণ করত। সেই সময় স্বপ্নাদেশ এবং গুরুজনের পরামর্শ অনুযায়ী পূর্ব বর্ধমান জেলার এই গ্রামের শুরু হয় মা কালীর আরাধনা। বিশ্বাস ছিল, মা কালী এই গ্রামকে কলেরার হাত থেকে রক্ষা করবেন। আর হয়েছিলও ঠিক সেটাই। মহিন্দর শ্মশানকালী পুজো শুরু হওয়ার পর থেকেই এই গ্রামে রোগ ব্যাধিতে মৃত্যুর সংখ্যা কমতে শুরু করে ধীরে ধীরে। আর সেখান থেকেই সারা বাংলায় জনপ্রিয় হয়ে যায় পূর্ব বর্ধমানের জৌগ্রামের এই বিশেষ কালীপুজো।
এই পুজোর একটি বিশেষ দিক হলো—এটি শ্মশানে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে শুরুতে অনেকেই এই পুজো করতে ভয় পেতেন। কোনো ব্রাহ্মণই এই দায়িত্ব নিতে চাননি। পরে রায়না গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবার সাহস করে এগিয়ে আসে এবং পুজোর দায়িত্ব গ্রহণ করে। সেই সময় থেকে আজও তারা বংশপরম্পরায় এই পুজো করে চলেছেন। এই পুজোয় প্রধান উপাসক মাকে তাঁদের গৃহদেবী রাজেশ্বরীর রূপে পূজা করেন। মায়ের মূর্তির রূপও বেশ আলাদা। সাধারণত আড়াই থেকে তিন ফুট উচ্চতার এই মূর্তির রয়েছে দুটি হাত। মায়ের গায়ের রং মিশমিশে কালো এবং তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন ভগবান শিবের উপর। তবে, মহাদেবের উপরে দাঁড়িয়ে থাকলেও এখানকার কালীমূর্তি জিভ কিন্তু বাইরে বের করা থাকে না, যা আমাদের প্রচলিত কালীমূর্তিগুলোর থেকে কিছুটা ভিন্ন।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো মূর্তি তৈরির পদ্ধতি। এখানে মূর্তি তৈরি হয় মদ, হাঁসের ডিম এবং আড়াই কোদাল মাটি দিয়ে। এই বিশেষ উপকরণ দিয়ে তৈরি মূর্তি পূজার আগেই নির্দিষ্ট স্থানে প্রস্তুত করা হয়। এরপর একজন ব্যক্তি মূর্তিকে মাথায় করে নিয়ে আসেন এবং নাচতে নাচতে শ্মশানে পৌঁছান। এই দৃশ্য দেখতে প্রচুর মানুষ জড়ো হন এবং এটি পুজোর অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। পুজোর সময় মাকে ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় একটি নির্দিষ্ট পুকুর থেকে ধরা মাছ, যা অবশ্যই পুড়িয়ে নিবেদন করা হয়। সারারাত ধরে পুজো চলে। আগে এই পুজো সম্পূর্ণ নির্জন শ্মশানে অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে পরিবেশ ছিল ভয়ঙ্কর ও নিস্তব্ধ। কিন্তু এখন এই পুজোর জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এবং পুরো এলাকায় আলোকসজ্জা করা হয়, যা এক উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে।
এই পুজোর আরেকটি বিশেষ রীতি হলো—যিনি পুজো করেন, তিনি মহিলাদের মতো সাদা-লালপাড় শাড়ি পরেন। এটি একটি প্রাচীন প্রথা, যা আজও পালন করা হয়। পুজোর সমাপ্তিও অত্যন্ত রহস্যময়। নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয়ের আগেই মায়ের বিসর্জন দিতে হয়। সেই সময় দু’জন নির্দিষ্ট ব্যক্তি মূর্তিকে নিয়ে পাশের দোগাছিয়া গ্রামের তালপুকুরের পাড়ে যান। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সময় অন্য কেউ তাদের সঙ্গে যেতে পারেন না। তারা মূর্তিকে পুকুরের ধারে রেখে অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসেন এবং ফিরে তাকান না। মানুষের বিশ্বাস, এরপর মা নিজেই জলে নেমে বিসর্জন গ্রহণ করেন। তাই যদি আপনারা কেউ এরকম একটা ঐতিহ্যবাহী পুজো দেখতে যেতে চান, তাহলে হাওড়া-বর্ধমান কর্ড লাইনে ট্রেনে জৌগ্রাম স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে টোটো করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় পুজোর স্থানে।





































Discussion about this post