ভারতের মাটিতে মেয়েদের লড়াই নতুন নয়। ইতিহাসের পাতায় বারবার ফিরে আসে নির্যাতন, ধর্ষণ, খুন আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কাহিনি। কখনও নির্ভয়ার মতো ঘটনা দেশকে নাড়িয়ে দেয়, কখনও দূর গ্রামের অন্ধকারে চাপা পড়ে যায় অসংখ্য নামহীন কণ্ঠস্বর। জাতপাত, লিঙ্গবৈষম্য আর ক্ষমতার দম্ভ মিলেমিশে তৈরি করে এক নির্মম বাস্তব, যেখানে একজন দলিত নারী হওয়া মানে অসহায়তা দ্বিগুণ। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সব কিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাঁদের প্রতিদিনের জীবন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র। এই ভয়াবহতার মধ্যেই কিছু মানুষ উঠে দাঁড়ান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, আশার আলো জ্বালান অন্ধকারের ভিতরে।
স্মিতা থমাস পারমার সেইরকমই এক নাম। গুজরাটের এক খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম। নিজের পথ বেছে নিয়েছেন বিহারের বৈশালী জেলার প্রান্তিক মানুষের পাশে থাকার মধ্যে। ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় পরিবেশে বড় হওয়া স্মিতা বিশ্বাস করতেন মানবসেবাই আসল। প্রথমে ব্যবসা বা নিজের সংগঠন গড়ার কথা ভাবলেও, চারপাশের দারিদ্র্য আর বঞ্চনা তাঁকে অন্য পথে নিয়ে যায়। পড়াশোনা শেষ করে কাজের সূত্রে বিহারে এসে তিনি বুঝতে পারেন, এখানে জাতিভেদ শুধু সামাজিক প্রথা নয়, বরং এক নির্মম বাস্তব, যা প্রতিদিন মানুষের জীবনকে গ্রাস করছে।
বৈশালীতে কাজ করতে গিয়ে স্মিতা দেখেছেন এমন দৃশ্য, যা কল্পনাকেও হার মানায়। মহাদলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের অমানবিক জীবনযাপন, সামান্য মজুরিতে কঠোর শ্রম, আর প্রতিবাদ করলেই ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ, এই সবকিছুই তাঁর চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় দলিত নারীদের ওপর অত্যাচার। বহু ক্ষেত্রে পরিবারের সামনেই তাঁদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন, অথচ ভয় আর সামাজিক চাপের কারণে কেউ মুখ খোলেন না। এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্মিতা তৈরি করেছেন সচেতনতা, সংগঠন আর প্রতিরোধের শক্তি। কখনও নির্যাতিতাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, কখনও আন্দোলন গড়ে তোলা। প্রতিটি পদক্ষেপেই তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন, হুমকি আর আক্রমণ উপেক্ষা করে।
আজ স্মিতা শুধু একজন সমাজকর্মী নন, অনেকের কাছে তিনি ভরসার প্রতীক। তাঁর স্বপ্ন একদিন দলিতরাই নিজের অধিকার নিজেরাই ছিনিয়ে নেবে, ভেঙে ফেলবে জাতপাতের শিকল। সেই দিনের অপেক্ষায় তিনি এখনও কাজ করে চলেছেন নিরলসভাবে। অন্ধকার যতই ঘন হোক, তিনি বিশ্বাস করেন একদিন ঝড় থামবেই, আর সেই ভোরের আলোয় উঠে দাঁড়াবে নতুন এক সমাজ, যেখানে ভয় নয়, থাকবে শুধু মানুষের মর্যাদা আর স্বাধীনতা।






































Discussion about this post