ভারতের সেন্সর বোর্ডের পাহারায় আবারও আটকে গেল এক শিশুর কণ্ঠস্বর। গাজায় নিহত পাঁচ বছরের ফিলিস্তিনি মেয়ে হিন্দ রাজাবের গল্প নিয়ে নির্মিত কাওথার বেন হানিয়ার চলচ্চিত্র The Voice of Hind Rajab। যে গল্প বিশ্বজুড়ে মানবিকতার প্রশ্ন তোলে, সেটি ভারতে মুক্তির আগেই থমকে দাঁড়িয়েছে। বিতরণকারী সংস্থার দাবি, “অত্যন্ত সংবেদনশীল” এই ছবিটি নাকি কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে একটি চলচ্চিত্র কি সত্যিই এতটাই শক্তিশালী যে তা রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নড়বড়ে করে দিতে পারে, নাকি এই ভয় আসলে সত্যকে আড়াল করার আরেকটি অজুহাত?
ছবিটি এমন এক বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে, যেখানে গাজার একটি গাড়িতে আটকে পড়া ছোট্ট হিন্দ রাজাব ইসরায়েলি হামলার মধ্যে প্রাণ হারায়। যুদ্ধের নির্মমতা, শিশুর অসহায়তা এবং মানবিক বিপর্যয়ের এই কাহিনি ইতিমধ্যেই ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে। ছবিটি পেয়েছে সিলভার লায়ন পুরস্কার। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ছবিটি মুক্তিও পেয়েছে। অথচ ভারত বাদ। বিতরণকারী মনোজ নন্দওয়ানা দাবি করেছেন, বোর্ডের এক সদস্য নাকি অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন এই ছবি মুক্তি পেলে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই যুক্তি যতটা রাজনৈতিক, ততটাই বিতর্কিত।
ভারতে চলচ্চিত্র সেন্সরশিপের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। গরম হাওয়া (১৯৭৩) থেকে ফায়ার (১৯৯৬), উড়তা পাঞ্জাব (২০১৬) থেকে পদ্মাবত (২০১৮) বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক ‘সংবেদনশীলতা’-র অজুহাতে ছবির ওপর কাঁচি চালানো হয়েছে বা মুক্তি বিলম্বিত হয়েছে। কখনও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি, কখনও ধর্মীয় অনুভূতি, কখনও বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এই সব কারণ দেখিয়ে শিল্পের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে বারবার। ফলে The Voice of Hind Rajab–এর ঘটনাটি যেন সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই আরেকটি অধ্যায়।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন; যুদ্ধ এবং মানবতার প্রশ্ন। ফিলিস্তিনে চলমান সহিংসতার প্রেক্ষাপটে একটি শিশুর মৃত্যুর গল্প তুলে ধরা কি সত্যিই রাজনৈতিক হুমকি, নাকি এটি আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয়? যদি একটি চলচ্চিত্র যুদ্ধের নির্মমতা দেখায়, তাহলে সেটিকে চুপ করিয়ে দেওয়া কি শান্তির পক্ষে যায়, নাকি বরং অন্যায়ের পক্ষ নেয়? শেষ পর্যন্ত, শিল্পের কাজ তো সত্য বলা, আর সেই সত্য যদি অস্বস্তিকর হয়, তবে হয়তো সেটিই সবচেয়ে বেশি শোনার প্রয়োজন।





































Discussion about this post