রমজানের নরম ভোরে কলকাতার আকাশ যখন আজানের সুরে জেগে ওঠে, তখন শহরের বহু স্মৃতি যেন নতুন করে প্রাণ পায়। পুরোনো গলির ভেতর দিয়ে ভেসে আসে প্রার্থনার আহ্বান, বাতাসে মিশে থাকে ইবাদতের শান্তি। এই শহর বহু ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সহাবস্থানের এক জীবন্ত উদাহরণ। সেই ইতিহাসের এক প্রাচীন নিদর্শন বসরী শাহ মসজিদ। কলকাতার প্রথম মসজিদ হিসেবে পরিচিত এই স্থাপনাটি। বসরী শাহ মসজিদ যেন অতীত ও বর্তমানকে এক সূক্ষ্ম সেতুবন্ধনে বেঁধে দেয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মসজিদ নীরবে দেখেছে শহরের পরিবর্তন, মানুষের জীবনযাত্রার রূপান্তর, আর ধর্মীয় অনুভূতির অবিচল ধারা।
কলকাতার ব্যস্ত শহুরে জীবনের মাঝেই অবস্থিত বসরী শাহ মসজিদ, যার অবস্থান চিৎপুর। চারপাশে পুরোনো বাড়ি, সরু গলি আর জনজীবনের কোলাহলের মাঝেও মসজিদটি নিজেকে ধরে রেখেছে। স্থাপত্যের দিক দিয়ে বিশাল বড় নয়। ছোট মিনার, গম্বুজের নকশা মিলিয়ে মসজিদটিকে এক আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে। মসজিদের স্থাপত্যের ঢঙটি হল বেঙ্গল স্টাইল আর্কিটেকচার। এই স্থাপত্যের ঢঙ থেকেই মসজিদের প্রাচীনত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় সহজেই। ভেতরে নামাজের জায়গা পরিষ্কার ও পরিপাটি, যেখানে স্থানীয় মানুষ ইবাদতে অংশ নেন। রমজানের সময় মসজিদের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ইফতারের আগে ভিড় বাড়ে, আর সন্ধ্যার পর তারাবির নামাজে ভরে ওঠে প্রার্থনার সুর।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, সুফি সাধক বসরী শাহের নাম অনুসারেই এই মসজিদের নামকরণ। নামে এই “বসরী” আছে মানেই ধরে নেওয়া যায় তিনি এসেছিলেন ইরাকের বসরা থেকে। তাঁর কবরও রয়েছে এই মসজিদের খুব কাছেই। তিনি এই অঞ্চলে এসে ধর্মীয় শিক্ষা ও মানবিকতার বাণী প্রচার করেছিলেন। তাঁর অনুসারীরাই পরে এখানে একটি ছোট মসজিদ নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, কলকাতায় মুসলিম বসতির সূচনালগ্নেই এই মসজিদের প্রতিষ্ঠা, তাই এটিকে শহরের প্রথম দিককার মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে ধরা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটি কয়েকবার সংস্কার হয়েছে, কিন্তু তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অটুট।
আজকের দিনে বসরী শাহ মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং কলকাতার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক নীরব প্রতীক। রমজান মাসে যখন মুসল্লিরা এখানে একত্রিত হয়ে নামাজ আদায় করেন, তখন মসজিদটি যেন অতীতের ইতিহাস ও বর্তমানের আধ্যাত্মিকতার মিলনস্থল হয়ে ওঠে। পুরোনো ইট-পাথরের ভেতর লুকিয়ে আছে বহু মানুষের প্রার্থনা, আশা আর বিশ্বাসের গল্প। কলকাতার দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবনের মাঝেও বসরী শাহ মসজিদ মনে করিয়ে দেয়, যে এই শহরের আত্মা গড়ে উঠেছে সহাবস্থান, ঐতিহ্য আর ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায়।
চিত্রঋণঃ ইন্দ্রজিৎ দাস







































Discussion about this post