“এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো…”—এই গানের লাইন যেন বুংকুলুং যাওয়ার পথেই বারবার মনে পড়ে। কারণ এনজেপি থেকে মাত্র দু’ঘণ্টার দূরত্বে পাহাড়, জঙ্গল, নদী আর চা-বাগানের অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট গ্রাম এখনও অনেকের কাছেই অচেনা। মিরিকগামী রাস্তার ১০ নম্বর ফটক থেকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে এগোতেই ধীরে ধীরে বদলে যায় দৃশ্যপট। দূরে মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির সবুজ হাতছানি, আর তারই কোলে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম বুংকুলুং। এখানে গোর্খা ও নিম্বু উপজাতিদের সহজ-সরল জীবন, অতিথিপরায়ণতা আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা দৈনন্দিনতা মন ছুঁয়ে যায়।

বুংকুলুংয়ের চারপাশে হাঁটলেই বোঝা যায় প্রকৃতি এখানে কতটা উদার। পাহাড়ের ধাপে ধাপে সবুজ ধানক্ষেত, তার ফাঁকে ফাঁকে কমলালেবুর বাগান, আর দূরে কুলকুল করে বয়ে চলা বালাসন নদী – সব মিলিয়ে দৃশ্যটা যেন ছবির মতো। পথে হঠাৎ দেখা মিলতে পারে ময়ূরের ঝাঁক কিংবা কালেজ ফ্লেজান্টের। অরণ্যের গভীর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক। ভোরবেলায় গাছে গাছে পাখির কলতানে ঘুম ভাঙে। গ্রে ট্রিপাই, ব্লু হুইস্লিং থ্রাশ, স্কারলেট মিনিভেটদের উপস্থিতি এই গ্রামের নিত্যসঙ্গী।

অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য বুংকুলুং একেবারে স্বর্গরাজ্য। গ্রামের একটু উপরে মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির কোলে রয়েছে জঙ্গল ক্যাম্প ও টেন্টে থাকার ব্যবস্থা। কাছেই বয়ে চলা মুর্মাখোলা নদী, চা-বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটার রোমাঞ্চ, লোহার ব্রিজের পাশ দিয়ে নেমে আসা ঝরনা – সব মিলিয়ে একেবারে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। গয়াবাড়ি ও মুর্মা চা-বাগানের সবুজ মখমল পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সময় যে কখন ফুরিয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। সন্ধ্যায় পাহাড়ের গায়ে জ্বলে ওঠা আলোর সারি নির্জনতাকে আরও গভীর করে তোলে।

শিলিগুড়ি বা এনজেপি থেকে সহজেই পৌঁছনো যায় বুংকুলুংয়ে। মিরিকের পথে দুধিয়া পেরিয়ে ডানদিকে ঘুরলেই এই গ্রাম। সারা বছরই এখানে যাওয়া যায়। এখানে বর্ষায় সবুজের ছড়াছড়ি, শীতেও কনকনে ঠান্ডা নয়, আর আকাশ প্রায়শই পরিষ্কার থাকে। এখানে থাকার জন্য আছে হোমস্টে, রিসর্ট ও টেন্ট। কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে, কংক্রিটের জঙ্গল ছেড়ে প্রকৃতির কোলে দু’দিন কাটাতে চাইলে বুংকুলুং নিঃসন্দেহে এক আদর্শ ঠিকানা।
চিত্র ঋণ – মুনমুন চ্যাটার্জী







































Discussion about this post