বাংলায় রাজনৈতিক নির্বাচনের আগে শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্রই রঙ, তুলি আর স্লোগানে ভরে ওঠে চারপাশ। এই পরম্পরার মধ্যেই উঠে আসেন দেওয়াল লিখন শিল্পীরা। তেমনই একজন হাবরার বাসিন্দা সঞ্জয় ভক্ত। সঞ্জয় নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আবদ্ধ করতে নারাজ। তাঁর মতে, একজন শিল্পীর পরিচয় তার শিল্পে, কোনো দলীয় পরিচয়ে নয়। তাই যে দল তাঁকে কাজ দেয়, তিনি তাদের কথা দেওয়ালে লেখেন, ছবি আঁকেন, কিন্তু নিজের শিল্পীসত্তাকে কোনোভাবেই রাজনীতির গণ্ডিতে বেঁধে ফেলেন না।
বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দেওয়াল লিখন এক বিশেষ ঐতিহ্য। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে নির্বাচনী রাজনীতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই রাজনৈতিক দলগুলি মতাদর্শ, স্লোগান এবং প্রার্থীর প্রচারের জন্য দেওয়ালকে ব্যবহার করত। একসময় সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের প্রসার সীমিত থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম ছিল এটিই। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যই নয়, কখনও কখনও ব্যঙ্গ, কৌতুক এবং সৃজনশীল শিল্পেরও প্রকাশ ঘটত। আজ ডিজিটাল প্রচারের যুগেও, বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে দেওয়াল লিখন এখনও এক অনন্য সাংস্কৃতিক চিহ্ন।
আসন্ন বিধানসভা ভোটকে কেন্দ্র করে বাংলায় যথারীতি উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনৈতিক আবহ। নানা মতাদর্শ, দলাদলি আর প্রতিযোগিতার মাঝে মানুষের মধ্যে বিভাজন, হানাহানি। এর মধ্যেই সঞ্জয়ের অবস্থান আলাদা। তিনি মনে করেন, রাজনীতি মানুষের জন্য, কিন্তু শিল্প মানুষের ঊর্ধ্বে। শিল্পের কাজ মানুষকে বিভক্ত করা নয়। তাঁর তুলির আঁচড়ে তাই কেবল দলীয় বার্তা নয়, ফুটে ওঠে এক বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি। সঞ্জয় ভক্ত জানেন, দেওয়াল লিখন মূলত রাজনৈতিক প্রচারের অংশ, তবুও তিনি চেষ্টা করেন নিজস্ব ছাপ রাখতে। তাঁর কাছে প্রতিটি দেওয়াল একটি ক্যানভাস। তাঁর শিল্পের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায় না; এটাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
সমাজের কাছে সঞ্জয়ের মত শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। যেখানে মানুষ ক্রমশ মতাদর্শের ভিত্তিতে বিভক্ত হচ্ছে, সেখানে তিনি দেখাচ্ছেন নিরপেক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর এই ‘আর্টিস্টের কোনো দল নেই’ ভাবনা শুধু শিল্পের ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের বৃহত্তর পরিসরেও প্রাসঙ্গিক। হয়তো তাঁর মতো মানুষদের থেকেই আমরা শিখতে পারি, যে ভিন্ন মত থাকলেও সহাবস্থান সম্ভব, আর সেই সহাবস্থানের সেতু গড়ে দিতে পারে শিল্পই।






































Discussion about this post