গ্রামবাংলার অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে এমন বহু মন্দির, যাদের নাম ইতিহাস বইয়ের পাতায় নেই, কিন্তু লোককথা ও বিশ্বাসে আজও জীবন্ত। শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু দূরে গেলেই ধরা পড়ে সেই অচেনা বিস্ময়। পূর্ব বর্ধমানের পাটুলির জামালপুরে অবস্থিত বাবা বুড়োরাজ মন্দির ঠিক তেমনই এক রহস্যময় তীর্থক্ষেত্র। বহু মানুষ এখানে আসেন রোগমুক্তি, মানত পূরণ ও মানসিক শান্তির আশায়। এই মন্দির শুধু ধর্মীয় আস্থার জায়গা নয়, বরং লোকসংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। শিয়ালদহ, হাওড়া বা ব্যান্ডেল থেকে কাটোয়া লোকাল ধরে পাটুলি স্টেশনে নামা যায়। কাটোয়ার তিন স্টেশন আগেই এই পাটুলি। পাটুলি কিংবা তার আগের স্টেশন বেলেরহাট থেকে যে কোনও লোকাল যানবাহনে সহজেই জামালপুর গ্রামে পৌঁছনো সম্ভব।

‘বুড়োরাজ’ নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর অর্থ। ‘বুড়ো শিব’ ও ‘ধর্মরাজ’ – এই দুই দেবতার মিলিত রূপই বুড়োরাজ। সাধারণত দেবতার সঙ্গে ‘নাথ’ বা ‘ঈশ্বর’ যুক্ত হলেও এখানে ‘রাজ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ দুই দেবতার সম্মিলিত শক্তিতে তিনি লোকদেবতায় পরিণত হয়েছেন। ধর্মরাজকে কেউ বুদ্ধের প্রতিরূপ বলেন, কেউ সূর্য উপাসনার ধারার সঙ্গে যুক্ত করেন। রাঢ় বাংলার নিম্নবর্গের সমাজে ধর্মঠাকুরের পুজো বহু পুরনো। লোককথা অনুযায়ী, নামদহ গ্রামের যদু ঘোষের প্রিয় গাভীর দুধ এক পাথরের উপর নিজে থেকেই ঝরে পড়ত। স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেখানে নির্মিত হয় কুঁড়েঘরের মতো মন্দির। আজও ইট-সিমেন্টের মন্দির এখানে নিষিদ্ধ। খড়ের ছাউনি আর মাটির মেঝেই বুড়োরাজের আবাস।

বৈশাখী পূর্ণিমায় এখানে বিশেষ গাজন অনুষ্ঠিত হয়। শিব ও ধর্মরাজ – দু’জনেরই মিলিত আরাধনা চলে। প্রসাদের থালায় দাগ টেনে ভাগ করা হয় দুই দেবতার জন্য। এটাই এই মন্দিরের অনন্য বৈশিষ্ট্য। ভক্তরা সোমবার উপবাস করেন, সেদ্ধ ভাত বা ফল খান। অনেকে রোগমুক্তির আশায় পুকুরে স্নান করেন, মানত করেন, ফুল দেন। কারও মানত পূরণ হলে নুড়ি রেখে যান বাবার কাছে। শিবরাত্রিতে সারা রাত পুজো হয়। গাজনের সময় সন্ন্যাসীরা কঠোর ব্রত পালন করেন। এই সব আচারেই ফুটে ওঠে বাংলার লোকধর্মের উদারতা ও সহাবস্থানের চিত্র।

বাবা বুড়োরাজকে মানুষ বিশ্বাস করেন জীবনের রক্ষাকর্তা হিসেবে। যক্ষ্মা, মৃগীরোগ, বাত কিংবা দীর্ঘদিনের অসুখ থেকে মুক্তির আশায় বহু মানুষ এখানে আসেন। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য মন্দিরের দরজা খোলা। এই উদারতাই বুড়োরাজকে আলাদা করে তোলে। শীতের রোদ মেখে একদিন কাটোয়া লোকালে উঠে পড়ুন। পৌঁছে যান জামালপুরে। অদ্ভুত এক শান্তি ছুঁয়ে যাবে মনকে।






































Discussion about this post