ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কোনো মানবাধিকার রক্ষা বা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নিরপেক্ষ উদ্যোগ নয়। সারা পৃথিবী জানে, এটি মূলত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার অতি পরিচিত কৌশল। তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলাকে আয়ত্তে আনতে ও বলিভারিয়ান প্রকল্পকে ভেঙে দিতে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ বিরোধ উসকে দেওয়া এবং সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে অবৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে বলিভারিয়ান রেভলিউশন নিছক ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি ছিল জমে থাকা অপমান, বঞ্চনার প্রবল বিস্ফোরণ। সাম্রাজ্যবাদী শোষণে ক্লান্ত ভেনেজুয়েলার দরিদ্র মানুষ ইতিহাসের মঞ্চে উঠে এসেছিল। সিমন বলিভারের নাম উচ্চারণ করে এই বিপ্লব ঘোষণা করেছিল রাষ্ট্র আর ধনীদের হাতে থাকবে না। আজও ভেনেজুয়েলার ‘জনগণ’ কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, ক্ষুব্ধ এক বাস্তব শক্তি।
এই বিস্ফোরণের কেন্দ্রে ছিলেন উগো শ্যাভেজ। একজন বিদ্রোহী, যিনি ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখেছিলেন ক্ষমতার ভেতরে থেকেই। সেনাবাহিনীর পোশাক গায়ে তিনি দেখেছিলেন রাষ্ট্র কীভাবে নিজ জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ১৯৯২ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থান তাঁকে পরাজিত করেনি, সেই পরাজয়ই তাঁকে অমর করে তোলে। কারাগারের দেয়াল ভেদ করে তাঁর কণ্ঠ পৌঁছে যায় দরিদ্র মানুষের ঘরে ঘরে। মুক্তির পর ব্যালট বাক্সে বিজয় ছিল এক ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ। লাতিন আমেরিকার বন্দুকনির্ভর রাজনীতির বিরুদ্ধে গণমানুষের রায়। নতুন সংবিধান, সামাজিক মিশন, রাজনৈতিক ভাষার আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শ্যাভেজ ঘোষণা করেছিলেন, রাষ্ট্র আর অভিজাতদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।
শ্যাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরোর কাঁধে এসে পড়ে দায়িত্ব। তেলের দামের পতন, নিষেধাজ্ঞার শ্বাসরোধ, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা যেন অবরুদ্ধ এক দুর্গ। মাদুরোর শাসনে ব্যর্থতা আছে, কঠোরতা আছে, বিতর্ক আছে, তবুও তিনি হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের প্রতীক। তাঁর বিরুদ্ধে আঘাত কেবল একজন রাষ্ট্রপতিকে সরানো নয়, বরং একটি গোটা রাষ্ট্রের অহং বা অভিমানকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করা। ভেনেজুয়েলার বর্তমান সংকট তাই আসলে ক্ষমতা দখলের নিষ্ঠুর লড়াই। এই লড়াইয়ের ছায়ায় অনিবার্যভাবে আসে সালভাদর আলেন্দের নাম। চিলির সেই সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট, যিনি দেখিয়েছিলেন ব্যালট বাক্স দিয়েও বিপ্লব সম্ভব। তাঁর রক্তাক্ত পতন ছিল সাম্রাজ্যবাদের সতর্কবার্তা।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সরাসরি আঘাত আঘাত ফেলছে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের জীবনে। খাদ্য, ওষুধ ও মুদ্রাসঙ্কট বেড়েছে। তবে, ওয়াশিংটনের ভাষ্যে এর দায় সমাজতন্ত্রের। নির্বাচিত সরকারকে অস্বীকার করে বিরোধী শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া, সামরিক হুমকি ও ‘শাসন পরিবর্তন’-এর খোলাখুলি ডাক আসলে লাতিন আমেরিকার পুরোনো ইতিহাসকেই পুনরাবৃত্ত করে, যেখানে জনগণের সিদ্ধান্ত নয়, বহুজাতিক কর্পোরেশন ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থই শেষ কথা বলে। ভেনেজুয়েলার সংকট তাই কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি সাম্রাজ্যবাদ বনাম জনগণের এক অসম সংঘর্ষ। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, স্বপ্ন দমন করা যায়, মুছে ফেলা যায় না। শ্যাভেজ, মাদুরো আর বলিভারিয়ান আন্দোলন সেই অসমাপ্ত স্বপ্নের উত্তরাধিকার। ফিদেল কাস্ত্রো, আর চে গুয়েভারার উত্তরাধিকারী উগো শ্যাভেজ। কিউবার ফিদেল সারা জীবন আমেরিকার পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধতা করে গেছেন। শ্যাভেজ, মাদুরোও তাইই করেছেন। শ্যাভেজকে আমেরিকা আটক করলে ছাড়িয়ে এনেছিলেন ফিদেল। মাদুরোর কি হবে? সংকটকালে পৃথিবীর কোথাও কোথাও কিছু কিছু মানুষ ঠিক জেগে উঠেছেন, ভেনিজুয়েলার মানুষও জেগে উঠবেন, অসম এই সংঘর্ষে জয় হবে তাঁদেরই।







































Discussion about this post